উপমহাদেশে বিভিন্ন বিদ্রোহ
ফকির সন্ন্যাসী আন্দোলন (১৭৬০-১৮০০)
→ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি ক্ষমতা লাভের পর সর্বপ্রথম যে বিদ্রোহ হয়েছিল তা ইতিহাসে ‘ফকির বিদ্রোহ নামে পরিচিত। ফকিররা উত্তর ও পশ্চিমবঙ্গ এবং বিহারের বিভিন্ন স্থানে বিদ্রোহ করেছিলেন। → ফকিরদের সাথে সন্ন্যাসীরাও ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন এবং কোম্পানির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন। → ১৭৬৪ সালে বক্সারের যুদ্ধে মীর কাসিম ইংরেজদের বিরুদ্ধে ফকির-সন্ন্যাসীদের সমর্থন কামনা করেন। ফকির-সন্ন্যাসীগণ মীর কাসিমের পক্ষে যুদ্ধও করেছিলেন। → বক্সারের যুদ্ধে(মীর কাসিম) পরাজিত হলেও ফকির-সন্ন্যাসীগণ তাদের আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকেন। → ফকির আন্দোলনের নেতা ছিলেন- (মজনু শাহ্, মুসা শাহ, চেরাগ আলী,(ভবানী পাঠক, (নূর আলদ্বীন, পীতাম্বর প্রমুখ। শাহের নেতৃত্বে ফকিরগণ রাজশাহী, বগুড়া, পাবনা, রংপুর, দিনাজপুর ঢাকায় ইংরেজ বিরোধী তৎপরতা শুরু করেন। মজনু → মজনু শাহের মৃত্যুর পর যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে ফকির আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পরে।
চাকমা বিদ্রোহ (১৭৭৬-১৭৮৯)
→ ১৭৬০ সালে চট্টগ্রাম জেলা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে আসে। → ১৭৬১ সন থেকে নতুন কোম্পানি সরকার বার বার রাজস্বের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে থাকে। → ১৭৭২-৭৩ সাল থেকে চাকমা রাজা জোয়ান বক্সকে মুদ্রায় রাজস্ব দিতে বাধ্য করা হয় এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে মুদ্রা অর্থনীতি প্রচলনের ব্যবস্থা করা হয়। এতে পার্বত্য জীবনে অস্থিরতা দেখা দেয়। → ১৭৭৬ সালে রাজস্বের হার আরও বৃদ্ধি করা হলে প্রধান নায়েব রানু খান রাজা খান রাজা জোয়ান বক্সের সম্মতিক্রমে কোম্পানির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। → রানু খানকে দমন করতে কোম্পানি বার বার সৈন্য প্রেরণ করে কিন্তু প্রত্যেক বার কোম্পানিকে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসতে হয়। এভাবে যুদ্ধ চলে প্রায় দশ বছর। অবশেষে কোম্পানি ক্লান্ত হয়ে ১৭৮৯ চাকমা রাজার সাথে সন্ধি স্থাপন করেন।
তিতুমীরের আন্দোলন
→ তিতুমীর ১৭৮২ সালে পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগণা জেলার বশিরহাট মহকুমার অন্তর্গত চাঁদপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিতুমীরের প্রকৃত নাম মীর নিসার আলী →ওয়াহাবি আন্দোলনের সূত্র ধরে তিতুমীর প্রথম বারাসাতে ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। → তিনি চব্বিশ পরগণার কিছু অংশ, নদীয়া ও ফরিদপুরের কিছু অংশ নিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা করেন। → তাঁকে দমন করতে প্রেরিত ইংরেজ বাহিনী তিতুমীরের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। এ বিদ্রোহ বারাসাতের বিদ্রোহ নামে পরিচিত। → বারাসাতের বিদ্রোহের পর তিতুমীর ইংরেজদের সাথে যুদ্ধ অনিবার্য বুঝতে পেরে নারিকেলবাড়িয়ায় ১৮৩১ সালে বাঁশের কেল্লা নির্মাণ করেন। → কোম্পানি সরকার ১৮৩১ সালে ইংরেজ (লেফটেন্যান্ট কর্নেল স্টুয়ার্টের নেতৃত্বে এক বিরাট বাহিনী প্রেরণ করে। ১৯ নভেম্বর ভীষণ যুদ্ধ হয়। ইংরেজ কামান ও গোলাগুলিতে বাঁশের কেল্লা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়। → তিতমীর ও তার চল্লিশ সহচর শহিদ হন। → তিতুমীর প্রথম বাঙ্গালি হিসাবে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানীর বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করে শহিদ হন।
ফরায়েজী আন্দোলন
→ বাংলায় ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর মুসলমান সমাজে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে চরম দুর্দশা নেমে আসে। মুসলমান সমাজের এ সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় অধঃপতন দেখে যিনি এর সংস্কারের জন্য এগিয়ে আসেন তিনি হলেন (হাজী শরীয়তুল্লাহ। → হাজী শরীয়তুল্লাহ ১৭৮১ খ্রিষ্টাব্দে (মাদারীপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। → ইসলামের (ফরজ) পালনের জন্য তিনি জোর প্রচার চালান। এ ফরজ থেকে এ আন্দোলনের নাম ফরায়েজি হয়েছে। → ফরায়েজি আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র ছিল ফরিদপুর জেলা → হাজী শরীয়তুল্লাহর মৃত্যুর পর এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন তাঁর সুযোগ্য পুত্র মুহসিনউদ্দীন ওরফে দুদু মিয়া। দুদুমিয়ার নেতৃত্বে ফরায়েজী আন্দোলন সংস্কার আন্দোলনের গণ্ডি পেরিয়ে রাজনৈতিক রূপ লাভ করে। → ফরায়েজি আন্দোলন ধর্মীয় সংস্কারের জন্য সূচিত হলেও পরবর্তীতে কৃষকদের জমিদার ও নীলকরদের অত্যাচার থেকে রক্ষা করা ছিল এ আন্দোলনের লক্ষ্য। → 'জমি থেকে খাজনা আদায় আল্লাহর আইনের পরিপন্থী'- খাজনা আদায়ের জন্য জমিদারদের অত্যাচার রোধকল্পে দুদুমিয়া আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য এ উক্তি করেন।
সাঁওতাল বিদ্রোহ
→ উত্তরবঙ্গ, পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের কিছু অঞ্চলে বসতি আছে সাঁওতাল জাতির। এ অঞ্চলকে এক সময় সাঁওতাল পরগণা বলা হতো। → ইংরেজ আমলে এ অঞ্চলের জমিদ জমিদারদের অত্যাচার বেড়ে গেলে তারা প্রতিবাদী হয়ে উঠে। → নেতা তাদের দুই ভাই -(সিধু আর কানু ইংরেজ সেনাপতি মেজর বারোজের নেতৃত্বে বিরাট বাহিনী আক্রমণ করে সাঁওতাল বাহিনীকে। সিধু ও কানুর নেতৃত্বে সেদিন ইংরেজ বাহিনীকে পরাজিত করে সাঁওতালরা বিজয়ী হয়েছিল। বিজয়ের দিনটি ছিল ১৮৫৫ সালের ১৬ জুলাই। → পরাজিত ইংরেজ ভীত হয়ে (বড়লাট লর্ড ডালহৌসির নির্দেশে আরও বড় সৈন্যবহর নিয়ে বিদ্রোহ দমাতে আসে। কিন্তু সাওতালদের প্রতিরোধের কারণে ইংরেজ বাহিনী ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। → বারবার এভাবে পরাস্ত হয়ে ইংরেজ বাহিনী সাঁওতাল বিদ্রোহের গ্রামগুলোতে হামলা চালায়। শিশু ও মহিলাদের নির্বিচারে হত্যা করে। → ১৮৫৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে নেতৃস্থানীয় সাঁওতালদের অধিকাংশ ধরা পড়ে এবং লোক দেখানো বিচার করে তাঁদের প্রকাশ্যে ফাঁসি দেয়া হয়।
নীল বিদ্রোহ
→ অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে ইউরোপে শিল্পবিপ্লবের ফলে বস্ত্রশিল্পের অভূতপূর্ব উন্নতি হয়। কাপড়ে রং করার জন্য নীলের চাহিদা বেড়ে যায়। এ ব্যবসা ছিল অত্যন্ত লাভজনক। ফলে ইংরেজরা এদেশে নীল চাষ শুরু করে। নীলকররা এদেশের চাষীদের বিভিন্নভাবে ঠকাত। এতে প্রতিবাদ করলে বা নীল চাষে সম্মত না হলে চাষী ও তার পরিবারের উপর চলত অমানুষিক অত্যাচার। নীল চাষীরা প্রথমে সংঘবদ্ধভাবে নীল চাষে অসম্মতি জানায়। নীল প্রতিরোধ আন্দোলনের প্রথম প্রবাদ পুরুষ সর্দার বিশ্বনাথ। সেকালে আমাদের জাতীয় চেতনার অভাবে দুর্ভাগ্যক্রমে বিশে ডাকাত নামে পরিচিত হয়েছিলেন তিনি। ১৮০৮ সালে ইংরেজদের হাতে ধরা পড়ে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হন। → তৎকালীন নদীয়া, বর্তমানে বাংলাদেশের যশোর জেলার চৌগাছায় সর্বপ্রথম বিদ্রোহ দেখা দেয় বিষ্ণুচরণ বিশ্বাস এবং দিগম্ভর বিশ্বাসের নেতৃত্বে। ১৮৫৯-১৮৬২ খ্রিষ্টাব্দে আন্দোলন ফরিদপুর, যশোর, পাবনা, রাজশাহী, মালদহ, নদীয়া, বারাসাত প্রভৃতি স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। → নীল বিদ্রোহ দমন করার জন্য ইংরেজ সরকার ‘নীল কমিশন' গঠন করে। কমিশন সরজমিনে নীলচাষীদের অভিযোগের সত্যতা পায় । → সরকার একটি আইন দ্বারা ঘোষণা করেন যে, নীলকররা বলপূর্বক চাষীদের নীলচাষে বাধ্য করতে পারবে না এবং সেটা করলে আইনত দণ্ডনীয় হবে। → এ আইন পাসের ফলে ১৮৬২ সালে নীল বিদ্রোহের অবসান হয়। নীল আন্দোলনের তীব্রতা ও ‘নীল কমিশন'-এর রিপোর্ট, সেই সঙ্গে রাসায়নিকভাবে প্রস্তুত নীল বাজারে আসার প্রভাবে বাংলায় নীল চাষ ধীরে ধীরে ফুরিয়ে যায় ।