সমাজে মূল্যবোধের গুরুত্ব
নৈতিকতা একটি ব্যাপক অর্থবোধক বিষয়। সমাজের প্রথা, আদর্শ, ধর্ম ও ন্যায়বোধ থেকে নৈতিকতার জন্ম। নৈতিক শক্তির প্রধান উপাদান হচ্ছে সততা ও নিষ্ঠা। নৈতিক শক্তির মূল প্রেরণা আসে ব্যক্তির সততা ও নিষ্ঠা থেকে। আর কর্তব্য পরায়ণতা সততা ও নিষ্ঠার মধ্যে অঙ্গীভূত। অপরপক্ষে, প্রদত্ত সম্ভাব্য উত্তরগুলোর মধ্যে উদারতা এবং মায়া ও মমতা মানবীয় গুণাবলির অন্তর্ভুক্ত।গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস, প্লেটো এবং এরিস্টটল সর্বপ্রথম নৈতিকতার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন। সক্রেটিস বলেছেন, ‘সৎ গুণই জ্ঞান’ (Virtue is knowledge)। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিরা অন্যায় করতে পারেন না এবং ন্যায়বোধের উৎস হচ্ছে ‘জ্ঞান’ (Knowledge) এবং অন্যায়বোধের উৎস হচ্ছে ‘অজ্ঞতা’ (ignorance)।
সভ্যতার অন্যতম প্রতিচ্ছবি হলো- সমাজ। সমাজ থেকে মানুষ সভ্যতার ছোঁয়া নিয়ে থাকে। সমাজে কারো ক্ষতি না করা, কারো মনে কষ্ট না দেয়া, কটুক্তি না করা প্রভৃতি হচ্ছে নীতি ও ঔচিত্যবোধ। নীতি ও ঔচিত্যবোধের অনুমোদন ব্যক্তি তার নিজের কাছ থেকেই পেয়ে থাকে। এর ফলে সে ন্যায়, অন্যায়, ভালো, মন্দ, উচিত, অনুচিতের পার্থক্য করে তার নিজের ভালো বা মঙ্গলের চেষ্টা করে।
● জে.এস. মেক্যান্ডির মতে - “Ethics is the science of general study of the idea involved in human life.”
● ম্যুর এর মতে - “শুভর প্রতি অনুরাগ ও অশুভর প্রতি বিরাগই হচ্ছে- নৈতিকতা”।
● আর.এম. ম্যাকাইভারের মতে “Law does not and can not cover all grounds of morality.” ।
● জনাথন হ্যাইট এর মতে “ধর্ম, ঐতিহ্য এবং মানব আচরণ- এ তিনটি থেকেই নৈতিকতার উদ্ভব হয়েছে” ।
সমাজে কোন ব্যক্তির ক্ষতি না করা, কারো মনে কষ্ট না দেওয়া, কটুক্তি না করা প্রভৃতি হচ্ছে নীতি ও ঔচিত্যবোধ। নীতি ও ঔচিত্যবোধের অনুমোদন ব্যক্তি নিজের নিকট থেকেই পেয়ে থাকে যার মূল প্রেরণা আসে মূল্যবোধের শিক্ষা থেকে। অর্থাৎ নীতি ও ঔচিত্যবোধ কখনো মূল্যবোধের অবক্ষয়ের নিয়ামক হতে পারে না।
১৭৪৮ সালে ফরাসি দার্শনিক মন্টেস্কু উক্ত গ্রন্থে সর্বপ্রথম পরিপূর্ণভাবে ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতির আধুনিক ব্যাখ্যা দান করেন। মন্টেস্কু ফরাসি দার্শনিক ও ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতির প্রবক্তা। তিনি ১৬৮৯ সালে ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৭৫৫ সালে প্যারিসে মারা যান।
যে চিন্তাভাবনা, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও সংকল্প মানুষের সামগ্রিক আচার আচরণ ও কর্মকাণ্ডকে নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত করে তাকেই মূল্যবোধ বলে। এই মূল্যবোধ শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য হলো সামাজিক অবক্ষয় রোধ করা।মূল্যবোধ আইন নয়। এর বিরোধিতা বেআইনি নয়। এটি মূলত এক প্রকার সামাজিক নৈতিকতা। মূল্যবোধের প্রতি সমাজে বসবাসকারী মানুষের শ্রদ্ধাবোধ আছে বলে মানুষ এটা মেনে চলে। সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে অগ্রগতির অন্যতম প্রধান ধাপ বা সোপান হলো শৃঙ্খলাবোধ। যে জাতি যত বেশি সুশৃঙ্খল সে জাতি তত বেশি উন্নত। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ একটি জাতিকে শৃঙ্খলাবদ্ধ হতে উদ্বুদ্ধ করে।
● এম. ডব্লিউ পামফ্রে এর মতে, “মূল্যবোধ হচ্ছে ব্যক্তি বা সামাজিক দলের অভিপ্রেত ব্যবহারে সুবিন্যস্ত প্রকাশ।”
● এইচ. ডি. ষ্টেইন-এর মতে, “জনসাধারণ যার সম্বন্ধে আগ্রহী, যা তারা কামনা করে, যাকে তারা অত্যাবশ্যক বলে মনে করে, যার প্রতি তাদের অগাধ শ্রদ্ধা বর্তমান এবং যা সম্পাদনের মাধ্যমে তারা আনন্দ উপভোগ করে তাকেই মূল্যবোধ বলে।”
● এম. আর. উইলিয়াম-এর মতে, “মূল্যবোধ মানুষের ইচ্ছার একটি প্রধান মানদণ্ড। এর আদর্শে মানুষের আচার-ব্যবহার ও রীতি-নীতি নিয়ন্ত্রিত হয় এবং এই মানদণ্ডে সমাজে মানুষের কাজের ভালো-মন্দ বিচার করা হয়।”
● এফ.ই.মেরিল বলেন, “সামাজিক মূল্যবোধ হচ্ছে বিশ্বাসের এক প্রকৃতি বা ধরন, যা গোষ্ঠীগত কল্যাণে সংরক্ষণ করাকে মানুষ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে।”
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল মনে করে সমকালীন বিশ্বের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে দুর্নীতি। এটি সুশাসনকে দুর্বল করে, সরকারি নীতিসমূহকে কলুষিত করে, সম্পদের অসম বণ্টন ঘটায় এবং বেসরকারি খাতকে বিশেষ করে দরিদ্র জনগণের দুর্ভোগ বাড়ায়।
সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রযন্ত্রের ভিতর যদি স্বচ্ছতা, বৈধতা, জবাবদিহিতা থাকে এতে যদি সকলের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে, বাক-স্বাধীনতাসহ সকল রাজনৈতিক স্বাধীনতা সুরক্ষার বন্দোবস্ত, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, আইনের অনুশাসন, আইন সভার নিকট শাসন বিভাগের দায়বদ্ধতা থাকে তখনই কেবল সুশাসন বজায় থাকে। জাতিসংঘের উন্নয়ন বিষয়ক বিশেষায়িত সংস্থা UNDP ১৯৯৭ সালে সুশাসনের যে সংজ্ঞা প্রদান করেছেন, সেখানে ‘টেকসই মানব উন্নয়নের জন্য শাসন’ উপ শিরোনামে যে পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়েছে, সেখানে বলা হয়েছে দেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের সকল পর্যায়ের কাজের মধ্যে শাসন প্রক্রিয়া প্রতীয়মান হবে।
জনমত হল- জনকল্যাণকর ও সৎ উদ্দেশ্যে প্রণোদিত প্রধান প্রধান জাতীয় সমস্যার উপর জনগণের প্রভাবশালী অংশের যে মত, তাকে বুঝায়। জনমত যুক্তিভিত্তিক ও সচেতন মত। সুষ্ঠু জনমত গড়ে তুলতে হলে চাই সুস্থ ও উন্নত রাজনৈতিক সংস্কৃতি।