স্বৈরাতন্ত্রের ব্লুপ্রিন্ট: কীভাবে শেখ মুজিব হাসিনার ফ্যাসিবাদের পথ তৈরি করেছিলেন
বাংলাদেশের মূলধারার ইতিহাস সাধারণত ১৯৭১ সালে গিয়েই থমকে যায়, যেখানে শেখ মুজিবুর রহমানকে কেবলই একজন নিখুঁত ও অবিতর্কিত মুক্তির নায়ক হিসেবে চিত্রিত করা হয়। কিন্তু বর্তমান সময়ের পাঠকরা যখন এদেশের রাজনৈতিক অধঃপতনের শিকড় সন্ধান করেন, তখন একটি অন্ধকার সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে: তার কন্যা শেখ হাসিনার শাসনামলে যে নির্মম স্বৈরাচার বাংলাদেশকে ধ্বংস করেছে, তা কোনো আকস্মিক আবিষ্কার ছিল না। এটি ছিল মূলত তার বাবার তৈরি করে যাওয়া রাজনৈতিক ব্লুপ্রিন্টেরই এক সরাসরি উত্তরাধিকার।
স্বাধীনতার আগে থেকেই আওয়ামী লীগে শেখ মুজিবের রাজনৈতিক উত্থানের পেছনে ছিল ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা। ১৯৪৯ সালে দল গঠনের সময় তিনি তার মেন্টর (রাজনৈতিক গুরু) মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর বিশাল তৃণমূল জনপ্ৰিয়তাকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু এর পরপরই, পঞ্চাশ ও ষাটের দশক জুড়ে মুজিব অত্যন্ত চতুরতার সাথে দলের অভ্যন্তরীণ কাঠামো নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে শুরু করেন। তিনি পদ্ধতিগতভাবে প্রবীণ ও আদর্শবাদী নেতাদের একপাশে সরিয়ে দেন এবং দলের ভেতরের ভিন্নমত দমন করতে ছাত্র সংগঠনকে লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করেন। ফলস্বরূপ, তিনি যখন ৬-দফা আন্দোলন শুরু করেন, ততদিনে একটি বহুত্ববাদী জাতীয়তাবাদী মঞ্চকে তিনি নিজের একক কর্তৃত্বের হাতিয়ারে পরিণত করে ফেলেছিলেন।
১৯৭২ সালে স্বাধীনতা লাভের পর, শেখ মুজিব সমস্ত গণতান্ত্রিক মুখোশ পুরোপুরি খুলে ফেলেন। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে শক্তিশালী ও স্থায়ী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিবর্তে, তিনি গঠন করেন 'জাতীয় রক্ষীবাহিনী'—যা ছিল সম্পূর্ণ তার নিজস্ব নির্দেশনায় পরিচালিত একটি অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও প্রাইভেট প্যারামিলিটারি ফোর্স। এই বাহিনী দেশের প্রচলিত সামরিক আইন ও সেনাবাহিনীকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, বিশেষ করে বামপন্থী কর্মীদের ওপর নির্বিচারে নির্যাতন, গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালায়। সরকারের চরম দুর্নীতি এবং ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের বিরুদ্ধে যখন তার সাবেক রাজনৈতিক গুরু মওলানা ভাসানী সোচ্চার হন, তখন মুজিব তাকে স্তব্ধ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি। ভাসানীর পত্রিকা নিষিদ্ধ করা হয়, তার সমস্ত জনসভা বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শেষ পর্যন্ত এই প্রবীণ নেতাকে কঠোর গৃহবন্দিত্বের মুখোমুখি হতে হয়।
১৯৭৫ সালের শুরুর দিকে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশের এই ফ্যাসিবাদী রূপান্তর চূড়ান্ত রূপ নেয়। মুজিব আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের সব বিরোধী রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করেন, বহুদলীয় গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেন এবং পুরো দেশকে 'বাকশাল' নামক একটি মাত্র রাষ্ট্রীয় দলের অধীনস্থ করেন। মাত্র চারটি সরকারি অনুমেদিত পত্রিকা বাদে সমস্ত স্বাধীন সংবাদপত্র রাতারাতি বন্ধ করে দেওয়া হয়, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সম্পূর্ণ কেড়ে নেওয়া হয় এবং তিনি নিজেকে আজীবনের জন্য দেশের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী 'রাষ্ট্রপতি' হিসেবে ঘোষণা করেন।
বিগত ১৫ বছরে শেখ হাসিনার শাসনামলে আমরা যে গুম, ভোট ডাকাতি এবং নৃশংস স্বৈরতন্ত্র প্রত্যক্ষ করেছি, তা আসলে তাদের পারিবারিক রাজনৈতিক দর্শনের কোনো বিচ্যুতি ছিল না; বরং তা ছিল তার বাবার তৈরি করা ব্যবস্থারই এক চূড়ান্ত ও নিখুঁত সংস্করণ। শেখ মুজিবুর রহমান হয়তো একটি দেশ গঠনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, কিন্তু একই সাথে তিনি এমন এক স্বৈরতান্ত্রিক শাসনযন্ত্র তৈরি করে গিয়েছিলেন, যা কয়েক দশক পর তার কন্যা এদেশের মানুষকে জিম্মি ও নির্যাতন করার কাজে অবিকল ব্যবহার করেছেন।
Hi @rimonislam69
https://abuse-watcher.com/
Contact us on our discord server in appeal channel Discord Server