মস্তিষ্কের অদ্ভুত অভ্যাস: কেন ভালো মুহূর্ত ভুলে যাই, কিন্তু নেতিবাচক স্মৃতি আজীবন মনে থাকে?
আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।
জীবনের দিকে একটু তাকিয়ে দেখুন। কেউ যদি একদিন আপনার দশটি ভালো কাজের প্রশংসা করে, আর একজন মাত্র একটি খারাপ মন্তব্য করে—দিন শেষে কোন কথাটি আপনার মাথায় সবচেয়ে বেশি ঘুরতে থাকে? বেশিরভাগ মানুষের উত্তর হবে, সেই একটিমাত্র নেতিবাচক মন্তব্য।আবার এমনও হয়, কোনো ভ্রমণে অসংখ্য আনন্দের মুহূর্ত ছিল, কিন্তু শেষের দিকে ঘটে যাওয়া একটি ছোট ঝামেলাই পুরো ভ্রমণের স্মৃতিকে ম্লান করে দেয়। কিংবা কোনো সম্পর্কে অসংখ্য সুন্দর স্মৃতি থাকা সত্ত্বেও শেষের কিছু কষ্টের মুহূর্তই সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে।প্রশ্ন হলো—এমনটা কেন হয়?আমাদের মস্তিষ্ক কি ইচ্ছা করে কষ্টের স্মৃতি ধরে রাখে?এর উত্তর লুকিয়ে আছে মানুষের বিবর্তন, স্নায়ুবিজ্ঞান এবং মনোবিজ্ঞানের এক চমৎকার বাস্তবতায়।বিজ্ঞানীরা এই প্রবণতাকে নেতিবাচকতার প্রতি ঝোঁক বলে থাকেন। অর্থাৎ মানুষের মস্তিষ্ক স্বাভাবিকভাবেই নেতিবাচক অভিজ্ঞতাকে ইতিবাচক অভিজ্ঞতার তুলনায় বেশি গুরুত্ব দেয়।হাজার হাজার বছর আগে মানুষ যখন জঙ্গলে বাস করত, তখন প্রতিটি মুহূর্ত ছিল বেঁচে থাকার লড়াই। কোথায় হিংস্র প্রাণী আছে, কোন ফল বিষাক্ত, কোন জায়গা বিপজ্জনক—এসব ভুলে গেলে জীবনই হারাতে হতো।কিন্তু সুন্দর সূর্যাস্ত কিংবা মিষ্টি কোনো ফলের স্বাদ ভুলে গেলে তেমন কোনো ক্ষতি হতো না।ফলে মানুষের মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে এমনভাবে গড়ে ওঠে, যাতে বিপদ, ব্যথা এবং খারাপ অভিজ্ঞতাগুলোকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে মনে রাখতে পারে।আজ আমরা আধুনিক পৃথিবীতে বাস করলেও আমাদের মস্তিষ্কের সেই পুরোনো নিরাপত্তাব্যবস্থা এখনো একইভাবে কাজ করে।তাই কেউ আমাদের প্রশংসা করলে আমরা কয়েক মিনিট খুশি থাকি। কিন্তু কেউ সমালোচনা করলে সেই কথাটি হয়তো কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাস পর্যন্ত মনে থাকে।এর পেছনে মস্তিষ্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ কাজ করে, যার নাম অ্যামিগডালা। এই অংশটি ভয়, বিপদ এবং তীব্র আবেগের সঙ্গে জড়িত ঘটনাগুলো খুব দ্রুত শনাক্ত করে। যখন কোনো নেতিবাচক ঘটনা ঘটে, তখন এটি অনেক বেশি সক্রিয় হয়ে যায় এবং সেই স্মৃতিকে দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষণ করার জন্য মস্তিষ্ককে সংকেত দেয়।অন্যদিকে আনন্দের অনেক মুহূর্ত আমাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়। ফলে সেগুলো একই রকম শক্তিশালীভাবে মনে গেঁথে থাকে না।এ কারণেই হয়তো পরীক্ষায় পঁচানব্বই নম্বর পেয়েও আমরা পাঁচ নম্বর কাটা নিয়ে বেশি ভাবি।একটি অনুষ্ঠানে সবাই প্রশংসা করলেও একজনের সমালোচনাই রাতে ঘুমাতে দেয় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও একই ঘটনা ঘটে। একশটি ইতিবাচক মন্তব্যের মাঝেও একটি নেতিবাচক মন্তব্য সারাদিন মন খারাপ করে দিতে পারে।কারণ আমাদের মস্তিষ্ক সেই একটি নেতিবাচক বিষয়কে সম্ভাব্য বিপদ হিসেবে বিশ্লেষণ করতে শুরু করে।মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, নেতিবাচক অভিজ্ঞতা সাধারণত ইতিবাচক অভিজ্ঞতার তুলনায় অনেক বেশি মানসিক শক্তি দখল করে।
একটি খারাপ অভিজ্ঞতার প্রভাব কাটিয়ে উঠতে অনেক সময় একাধিক ভালো অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়।এ কারণেই সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ছোট ছোট আঘাত দীর্ঘ সময়ের জন্য থেকে যায়।অনেকেই বলেন, “আমি সব ভুলে গেছি।”কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, স্মৃতি ভুলে গেলেও সেই অনুভূতির প্রভাব অনেক দিন রয়ে যায়।মজার বিষয় হলো, আমাদের মস্তিষ্ক সব নেতিবাচক স্মৃতি ধরে রাখে না। যেসব স্মৃতির সঙ্গে প্রবল আবেগ জড়িয়ে থাকে, সেগুলোই সবচেয়ে বেশি মনে থাকে।যেমন—প্রথম অপমান।প্রথম বড় ব্যর্থতা।বিশ্বাসভঙ্গের মুহূর্ত।প্রিয় মানুষের বলা কষ্টের কথা।এসব ঘটনা শুধু ঘটনা হিসেবে নয়, অনুভূতি হিসেবেও মস্তিষ্কে সংরক্ষিত হয়।তাই অনেক বছর পরেও সামান্য কোনো ঘটনা পুরোনো কষ্টকে আবার জাগিয়ে তুলতে পারে।তবে এর মানে এই নয় যে আমাদের জীবন শুধু নেতিবাচক স্মৃতির মধ্যেই আটকে থাকবে।সুখবর হলো, মস্তিষ্ক যেমন নেতিবাচক স্মৃতি ধরে রাখতে পারে, তেমনি সচেতন চর্চার মাধ্যমে ইতিবাচক স্মৃতিকেও আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।যখন আমরা কৃতজ্ঞতার অভ্যাস করি, প্রতিদিনের ছোট ছোট ভালো মুহূর্ত লিখে রাখি, প্রিয় মানুষের সঙ্গে সুন্দর সময় কাটাই কিংবা নিজের অর্জনগুলো মনে করি, তখন ধীরে ধীরে মস্তিষ্ক নতুন ইতিবাচক সংযোগ তৈরি করতে শুরু করে।এটিকে বলা হয় মস্তিষ্কের অভিযোজনক্ষমতা। অর্থাৎ নতুন অভিজ্ঞতার মাধ্যমে মস্তিষ্ক নিজেকে পরিবর্তন ও নতুনভাবে গড়ে তোলার ক্ষমতা।এ কারণেই অনেক মনোবিজ্ঞানী প্রতিদিন অন্তত তিনটি ভালো ঘটনার কথা লিখে রাখতে বলেন।এটি কোনো জাদু নয়, বরং মস্তিষ্ককে নতুনভাবে অভ্যস্ত করার একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি।আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমরা প্রায়ই নেতিবাচক চিন্তাকেই বাস্তবতা ভেবে বসি।কেউ উত্তর দিতে দেরি করলে মনে হয়, সে হয়তো রাগ করেছে।কেউ কম কথা বললে মনে হয়, সে আর আগের মতো ভালোবাসে না।অথচ বাস্তবে হয়তো সে শুধু ব্যস্ত ছিল।আমাদের মস্তিষ্ক সম্ভাব্য বিপদ খুঁজতে গিয়ে অনেক সময় এমন গল্প বানিয়ে ফেলে, যার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো সম্পর্কই থাকে না।তাই প্রতিটি নেতিবাচক চিন্তাকে সত্য বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।নিজেকে মাঝে মাঝে একটি প্রশ্ন করুন—
“আমি যা ভাবছি, সেটির পক্ষে সত্যিই কি কোনো প্রমাণ আছে?”এই একটি প্রশ্নই অনেক অপ্রয়োজনীয় দুশ্চিন্তা কমিয়ে দিতে পারে।সবচেয়ে বড় কথা, নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া খুব জরুরি।অনেকেই নিজের একটি ভুলকে এমনভাবে মনে রাখেন, যেন সেটিই তাঁর পুরো পরিচয়।কিন্তু একজন মানুষের পরিচয় তার একটি ব্যর্থতা নয়।একটি ভুল নয়।একটি খারাপ দিনও নয়।মানুষ শেখে, বদলায়, আবার নতুন করে শুরু করে।মস্তিষ্কের নেতিবাচক স্মৃতি ধরে রাখার এই প্রবণতা আমাদের শত্রু নয়। একসময় এটি আমাদের বেঁচে থাকতে সাহায্য করেছে। কিন্তু বর্তমান জীবনে যদি আমরা এটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে না শিখি, তাহলে এটি আমাদের অকারণ ভয়, উদ্বেগ এবং আত্মবিশ্বাসের অভাবের দিকে ঠেলে দিতে পারে।তাই যখনই কোনো পুরোনো কষ্ট বারবার মনে পড়বে, তখন নিজেকে দোষ না দিয়ে মনে রাখুন—এটি আপনার দুর্বলতা নয়; এটি আপনার মস্তিষ্কের স্বাভাবিক একটি বৈশিষ্ট্য।তবে সেই বৈশিষ্ট্যের কাছে সারাজীবন হার মেনে থাকারও প্রয়োজন নেই।কারণ মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু স্মৃতি নয়, নতুন সুন্দর স্মৃতি তৈরি করার ক্ষমতা।আর হয়তো সেই কারণেই জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায় এখনো লেখা বাকি।
সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।
Support @heroism Initiative by Delegating your Steem Power
| 250 SP | 500 SP | 1000 SP | 2000 SP | 5000 SP |
VOTE @bangla.witness as witness
OR