বড় হওয়া মানে শুধু বয়স বাড়া নয়, নীরবে সহ্য করতে শেখা
আসসালামু-আলাইকুম। আদাব-নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।
বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানুষ শুধু লম্বা হয় না, পরিণতও হয় না; বরং অনেক সময় সে ভেতরে ভেতরে ভারী হয়ে যায়। তার মাথায় জমতে থাকে চিন্তা, বুকের ভেতর জমতে থাকে না-বলা কথা, আর মুখের হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে একগাদা অস্থিরতা। ছোটবেলায় কষ্ট পেলে কেঁদে ফেলা যেত, মন খারাপ হলে কাউকে গিয়ে বলা যেত, রাগ হলে মুখ ফুলিয়ে বসে থাকা যেত। কিন্তু বড় হওয়ার পর সবকিছু এত সহজ থাকে না। তখন কষ্ট পেলেও চুপ থাকতে হয়, ভেঙে পড়লেও স্বাভাবিক থাকার অভিনয় করতে হয়, কারণ জীবন তখন আর শুধু অনুভূতির ওপর চলে না—চলে দায়িত্ব, সময়, বাস্তবতা আর চাপের ওপর।
একটা সময় আসে, যখন মানুষ বুঝতে পারে—তার কষ্টের কথা সবার কাছে বললেও সবাই সেটা বুঝবে না। কেউ শুনবে, কিন্তু অনুভব করবে না। কেউ সহানুভূতি দেখাবে, কিন্তু পাশে থাকবে না। কেউ হয়তো বলবে “এগুলো নিয়ে এত ভাবিস না”, “সব ঠিক হয়ে যাবে”, “তুই অনেক বেশি ইমোশনাল”—কিন্তু তার ভেতরে যে প্রতিদিন একটু একটু করে যুদ্ধ চলছে, সেটা কেউ দেখবে না। তখন মানুষ ধীরে ধীরে নিজের কষ্ট নিজেই বয়ে বেড়াতে শেখে। আর এই শেখাটার নামই হয়তো বড় হওয়া।
বড় হওয়ার সবচেয়ে কষ্টের দিকগুলোর একটি হলো—নিজের ইচ্ছার চেয়ে প্রয়োজনকে বেশি গুরুত্ব দিতে শেখা। তুমি হয়তো ভীষণ ক্লান্ত, ভীষণ ভেঙে পড়েছ, কারও সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না, কিছুই ভালো লাগছে না—তবুও তোমাকে কাজ করতে হবে, দায়িত্ব পালন করতে হবে, স্বাভাবিক থাকতে হবে। কারণ পৃথিবী তোমার মন খারাপের জন্য থেমে থাকবে না। তোমার ভেতরে ঝড় উঠলেও বাইরের পৃথিবী একই গতিতে চলবে। আর তখন তুমি বুঝবে, বড় হওয়া মানে নিজের অনুভূতিকে সবসময় priority দিতে না পারা। অনেক সময় নিজের কান্নাকে পিছিয়ে রেখে প্রয়োজনের কাজটা আগে করতে হয়।
আমরা যখন ছোট থাকি, তখন “সমস্যা” শব্দটার মানে খুব ছোট ছিল। পরীক্ষায় কম নম্বর, বন্ধুর সাথে ঝগড়া, পছন্দের জিনিস না পাওয়া—এসবই ছিল বড় সমস্যা। কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে সমস্যার ধরন বদলে যায়। তখন চিন্তা হয় ভবিষ্যৎ নিয়ে, ক্যারিয়ার নিয়ে, পরিবার নিয়ে, সম্পর্ক নিয়ে, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিয়ে, নিজের অবস্থান নিয়ে। একটা সময় মনে হয়, মাথার ভেতর যেন সবসময় কিছু না কিছু চলছে। কোনো কিছু পুরোপুরি উপভোগ করার আগেই মনে পড়ে যায়—আরও কত কাজ বাকি, কত চিন্তা জমে আছে, কত হিসাব মেলেনি। তখন জীবনটা আর শুধু বেঁচে থাকার মতো লাগে না; মনে হয়, যেন প্রতিদিন একটু একটু করে টিকে থাকার চেষ্টা করছি।
বড় হওয়ার সাথে সাথে মানুষ আরও একটা জিনিস শেখে—সবাইকে নিজের কষ্ট বোঝানো যায় না। কারণ মানুষ যত বড় হয়, তত বেশি বুঝতে পারে যে প্রত্যেকেরই নিজস্ব লড়াই আছে। সবাই নিজের মতো ক্লান্ত, নিজের মতো ব্যস্ত, নিজের মতো ভাঙা। তাই নিজের ভেতরের ঝড় নিয়ে সবসময় কারও দরজায় যাওয়া যায় না। একসময় মানুষ শিখে যায়, কিছু কষ্ট নিজের কাছেই রাখতে হয়। কিছু কান্না বাথরুমের আয়নার সামনে মুছে ফেলতে হয়। কিছু রাত নির্ঘুম কাটিয়েও সকালে উঠে এমনভাবে চলতে হয় যেন কিছুই হয়নি। এটাই হয়তো বড় হওয়ার সবচেয়ে নীরব শিক্ষা—নিজেকে নিজেই সামলে নেওয়া।
তবে বড় হওয়ার মানে এই না যে মানুষ অনুভূতিহীন হয়ে যায়। বরং উল্টোটা হয়—সে আগের চেয়ে অনেক বেশি অনুভব করে, কিন্তু প্রকাশ কম করে। আগে যে কষ্টে সে চিৎকার করে কাঁদত, এখন সেই কষ্টে হয়তো শুধু চুপ করে যায়। আগে যে অপমান তাকে ভেঙে দিত, এখন সে সেটা মুখে না এনে নিজের ভেতরে জমিয়ে রাখে। আগে যে অবহেলা নিয়ে সে প্রশ্ন করত, এখন হয়তো আর কিছুই বলে না। কারণ বড় হওয়ার পর মানুষ বুঝে যায়, সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না, সব অভিযোগের বিচার হয় না, সব কষ্টের ব্যাখ্যাও মেলে না। তাই অনেক কিছুই সে ছেড়ে দিতে শেখে—অথবা সহ্য করতে শেখে।
এই সহ্য করার মধ্যেই একটা অদ্ভুত ক্লান্তি আছে। কারণ মানুষ যত বেশি চুপচাপ সহ্য করতে শেখে, তত বেশি তার ভেতরে জমতে থাকে অদৃশ্য চাপ। বাইরে থেকে তাকে দেখে মনে হয়, সব সামলে নিচ্ছে, সব ঠিক আছে, সে অনেক strong। কিন্তু বাস্তবে strong হওয়া আর strong দেখানোর মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। অনেক সময় মানুষ strong না, সে শুধু ভেঙে পড়ার সুযোগ পায় না। সে কাঁদতে চায়, থেমে যেতে চায়, একটু বিশ্রাম নিতে চায়—কিন্তু পারে না। কারণ তার ওপর নির্ভর করে কিছু মানুষ, কিছু দায়িত্ব, কিছু স্বপ্ন। তাই সে চুপচাপ আবার উঠে দাঁড়ায়, আবার হাসে, আবার বলে “আমি পারব”—যদিও ভেতরে ভেতরে সে জানে, সে কতটা ক্লান্ত।
বড় হওয়ার আরেকটা কঠিন দিক হলো—মানুষকে হারানোর অভ্যাস হয়ে যাওয়া। ছোটবেলায় মনে হতো, কাছের মানুষ মানেই চিরদিনের জন্য কাছের। কিন্তু বড় হতে হতে আমরা দেখি, মানুষ বদলায়, সম্পর্ক বদলায়, পরিস্থিতি বদলায়। কেউ দূরে সরে যায়, কেউ ব্যস্ত হয়ে যায়, কেউ প্রয়োজন শেষ হলে আর খোঁজও নেয় না। শুরুতে এসব খুব কষ্ট দেয়, খুব ভাঙে। কিন্তু ধীরে ধীরে মানুষ এটাও সহ্য করতে শেখে। শিখে যায়, সব সম্পর্ক ধরে রাখা যায় না, সব মানুষকে পাশে রাখা যায় না, আর সব বিদায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করাও সম্ভব না। এই মেনে নেওয়ার ক্ষমতাটাও বয়সের সাথে আসে—যদিও এটা কখনোই সহজ না।
তবু বড় হওয়ার মধ্যে শুধু কষ্টই নেই; আছে এক ধরনের গভীর উপলব্ধিও। বড় হতে হতে মানুষ বুঝতে শেখে কোন জিনিসগুলো সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ, কোন মানুষগুলো সত্যিই নিজের, কোন কষ্টগুলো এড়িয়ে যাওয়া যায়, আর কোন জায়গায় নিজের শান্তিটাকে সবার আগে রাখতে হয়। সে শিখে যায়, সবসময় সবার মন রাখতে গেলে একসময় নিজের মনটাই হারিয়ে যায়। সে বুঝতে শেখে, সব জায়গায় নিজেকে প্রমাণ করার দরকার নেই, সব সম্পর্কে নিজেকে নিঃশেষ করে দেওয়ার দরকার নেই। বড় হওয়ার সবচেয়ে সুন্দর দিক হয়তো এটাই—মানুষ ধীরে ধীরে নিজেকে চিনতে শেখে, নিজের সীমা বুঝতে শেখে, আর নিজের ভেতরের শক্তিটাকে আবিষ্কার করতে শেখে।
কিন্তু সত্যিটা এই যে, বড় হওয়া কখনোই খুব glamorous কিছু না। এটা খুব নিঃশব্দ একটা প্রক্রিয়া। এখানে তেমন হাততালি নেই, তেমন উদযাপন নেই। এখানে আছে গভীর রাতে চুপচাপ কাঁদা, ভোরে উঠে আবার স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া। আছে না-পারা সত্ত্বেও “পেরে যাওয়া”র অভিনয়। আছে অনেক ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও মুখ বন্ধ রাখা। আছে কাউকে কিছু না বলেই নিজের ভাঙা অংশগুলো নিজে নিজে জোড়া লাগানোর চেষ্টা। তাই বড় হওয়া মানে শুধু জন্মদিনের কেকের ওপর সংখ্যা বাড়া না; বড় হওয়া মানে জীবনের কঠিন সত্যিগুলোকে মেনে নিয়েও পথ চলতে শেখা।
একটা সময়ের পর মানুষ বুঝে যায়, বড় হওয়া মানে সবসময় শক্ত থাকা না; বরং ভেঙে পড়েও আবার উঠে দাঁড়াতে পারা। বড় হওয়া মানে সবসময় হাসিখুশি থাকা না; বরং মন খারাপ নিয়েও দিনের কাজ শেষ করা। বড় হওয়া মানে কষ্ট না পাওয়া না; বরং কষ্ট পেয়েও নিজের দায়িত্ব থেকে পালিয়ে না যাওয়া। আর বড় হওয়া মানে সবচেয়ে বেশি—চুপচাপ সহ্য করতে শেখা, কিন্তু তবুও পুরোপুরি হার না মানা।
কারণ জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষাগুলো বই থেকে পাওয়া যায় না, বয়সের সংখ্যাতেও লেখা থাকে না। সেগুলো শেখায় সময়, মানুষ, ব্যর্থতা, অবহেলা, অপেক্ষা আর না-বলা কষ্ট। আর সেই শিক্ষাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কঠিন শিক্ষা সম্ভবত এটিই—বড় হওয়া মানে বয়স বাড়া না, বড় হওয়া মানে নীরবে অনেক কিছু সহ্য করেও এগিয়ে যেতে শেখা।
সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।
| 250 SP | 500 SP | 1000 SP | 2000 SP | 5000 SP |
VOTE @bangla.witness as witness
OR
This post has been upvoted by @italygame witness curation trail
If you like our work and want to support us, please consider to approve our witness
Come and visit Italy Community