“অভিমান জমতে জমতে একসময় ভালোবাসাকেও হার মানায়”
আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।
অভিমান আসলে ভালোবাসারই আরেকটা রূপ। যাকে নিয়ে আমাদের কোনো অনুভূতি নেই, তার ওপর আমরা অভিমানও করি না। আমরা অভিমান করি সেই মানুষটার ওপর, যার কাছ থেকে আমরা গুরুত্ব আশা করি, সময় আশা করি, বোঝাপড়া আশা করি, একটু যত্ন আশা করি। কিন্তু সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন সেই অভিমানগুলো বারবার হয়, আর সেগুলো কেউ বুঝতে চায় না। যখন একজন মানুষ বারবার কষ্ট পায়, বারবার নিজেকে বুঝিয়ে নেয়, বারবার ভাবে “আজ না হয় থাক, পরে ঠিক হয়ে যাবে”, তখন সে আসলে সম্পর্কটাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু সব চেষ্টা একা একা করতে করতে একসময় সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
একটা সম্পর্কের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো—যখন মানুষ কষ্ট পেতে পেতে চুপ হয়ে যায়। কারণ চুপ হয়ে যাওয়া মানে কষ্ট কমে যাওয়া না, বরং কষ্ট এতটাই গভীরে চলে যাওয়া যে সেটা আর ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। শুরুতে মানুষ রাগ করে, অভিমান করে, অভিযোগ করে, বোঝাতে চায় কোথায় তার কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু যখন সে দেখে, তার কথাগুলো গুরুত্ব পাচ্ছে না, তার অনুভূতিগুলো “ওভাররিঅ্যাকশন” হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, তখন সে ধীরে ধীরে চুপ হয়ে যায়। আর এই চুপ হয়ে যাওয়াটাই সবচেয়ে বড় বিপদ। কারণ যেখানে কথা থেমে যায়, সেখানে দূরত্ব তৈরি হতে সময় লাগে না।
ভালোবাসা টিকে থাকে শুধু “আমি তোমাকে ভালোবাসি” বলায় না; ভালোবাসা টিকে থাকে বোঝাপড়ায়, গুরুত্ব দেওয়ায়, ছোট ছোট কষ্টগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে শুনতে পারায়। কিন্তু যখন একজন মানুষ বারবার নিজেকে অবহেলিত অনুভব করে, তখন তার ভেতরে জমতে থাকে অভিমান। সে হয়তো বাইরে থেকে আগের মতোই কথা বলে, আগের মতোই পাশে থাকে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে একটু একটু করে দূরে সরে যেতে থাকে। কারণ মানুষ সবকিছু সহ্য করতে পারে, কিন্তু নিজেকে অপ্রয়োজনীয় মনে হওয়াটা সহ্য করতে পারে না।
অভিমানের একটা অদ্ভুত স্বভাব আছে। এটা একদিনে সম্পর্ক নষ্ট করে না। এটা ধীরে ধীরে মানুষকে বদলে দেয়। যে মানুষটা একসময় একটা মেসেজের অপেক্ষায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকত, সে একসময় আর অপেক্ষা করে না। যে মানুষটা ছোট একটা ভুলেও কেঁদে ফেলত, সে একসময় কাঁদাও বন্ধ করে দেয়। যে মানুষটা একসময় হাজার অভিমানের পরও ফিরে আসত, সে একসময় আর ফিরে আসার কারণ খুঁজে পায় না। তখন সম্পর্কটা বাইরে থেকে ঠিকঠাক দেখালেও ভেতর থেকে ফাঁপা হয়ে যায়। ভালোবাসা তখনও হয়তো পুরোপুরি শেষ হয় না, কিন্তু সেই ভালোবাসার ওপর অভিমানের স্তর এত বেশি জমে যায় যে মানুষ আর সেই ভালোবাসা অনুভব করতে পারে না।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, অনেক সময় যে মানুষটা অভিমান করছে, সে নিজেও চায় না সম্পর্কটা শেষ হোক। সে শুধু চায়, কেউ তার অভিমানটা বুঝুক। কেউ এসে বলুক, “আমি বুঝেছি তুমি কষ্ট পেয়েছ”, “আমি জানি তোমার মন খারাপ”, “চলো কথা বলে ঠিক করি।” কিন্তু সব সম্পর্কেই এমন মানুষ পাওয়া যায় না, যে অভিমানকে গুরুত্ব দিতে জানে। অনেকেই ভাবে, “অভিমান তো সাময়িক, এটা নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যাবে।” অথচ তারা বুঝতে পারে না, সাময়িক অভিমান যদি বারবার অবহেলিত হয়, তাহলে সেটাই একসময় স্থায়ী দূরত্ব হয়ে দাঁড়ায়।
অনেক সম্পর্কের শেষটা খুব নাটকীয় হয় না। চিৎকার, কান্না, ঝগড়া—এসব দিয়েও সব সম্পর্ক শেষ হয় না। কিছু সম্পর্ক শেষ হয় খুব নীরবে। একসময় কথা কমে যায়, আগ্রহ কমে যায়, অনুভূতি প্রকাশ কমে যায়। “কেমন আছ?” প্রশ্নটার ভেতর আর আগের মতো উদ্বেগ থাকে না, “খেয়েছ?” কথাটার ভেতর আর যত্ন থাকে না, “রাগ করেছ?” প্রশ্নটার ভেতর আর সত্যিকারের ভয় থাকে না। সবকিছু ধীরে ধীরে অভ্যাসের মতো হয়ে যায়, অথচ ভেতরে ভেতরে সম্পর্কটা মরে যেতে থাকে। আর এই মৃত্যুর সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো জমে থাকা অভিমান।
অভিমান জমার পেছনে শুধু ভুল বোঝাবুঝি দায়ী না; অনেক সময় দায়ী থাকে ইগোও। দুজন মানুষই হয়তো একে অপরকে ভালোবাসে, কিন্তু কেউ আগে এগিয়ে এসে “সরি” বলতে চায় না, কেউ আগে মনের কথা খুলে বলতে চায় না। একজন ভাবে, “আমি কেন সবসময় আগে বুঝব?” আরেকজন ভাবে, “আমি এত কষ্ট পেয়েও যদি আমাকে বুঝতে না পারে, তাহলে বলেও লাভ কী?” এই দুই ভাবনার মাঝখানে সম্পর্কটা আটকে যায়। ভালোবাসা তখনও থাকে, কিন্তু সেই ভালোবাসার ওপর অভিমান, অহংকার আর না-বলা কথার এত চাপ পড়ে যে সম্পর্কটা শ্বাস নিতে পারে না।
সবচেয়ে বড় সত্যিটা হলো—ভালোবাসা সবসময় সম্পর্ক বাঁচানোর জন্য যথেষ্ট না। ভালোবাসার সাথে দরকার যত্ন, ধৈর্য, বোঝাপড়া, আর সবচেয়ে বেশি দরকার যোগাযোগ। কারণ মনের কথা চেপে রাখলে, কষ্ট লুকিয়ে রাখলে, অভিমান জমতেই থাকবে। আর একসময় সেই জমে থাকা অভিমান এমন জায়গায় পৌঁছে যাবে, যেখানে “ভালোবাসি” শব্দটাও আর কোনো কাজ করবে না। কারণ তখন মানুষ ভালোবাসা শুনতে চায় না, সে চায় অনুভব করতে—সে সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ কি না, তাকে সত্যিই বোঝা হচ্ছে কি না, তার কষ্টটা সত্যিই কারও কাছে মূল্য রাখে কি না।
একটা মানুষ যখন অনেক অভিমান নিয়েও থেকে যায়, তখন বুঝতে হবে সে এখনো সম্পর্কটাকে ভালোবাসে। কিন্তু যখন সে অভিমান করাও বন্ধ করে দেয়, তখন বুঝতে হবে সে ভেতরে ভেতরে হাল ছেড়ে দিয়েছে। কারণ অভিমান থাকে প্রত্যাশা থেকে, আর প্রত্যাশা থাকে ভালোবাসা থেকে। যখন সেই প্রত্যাশাই মরে যায়, তখন সম্পর্কটাও আসলে শেষের দিকে চলে যায়। তাই সম্পর্ক বাঁচাতে চাইলে শুধু ভালোবাসার কথা বললেই হবে না, অভিমানগুলোকেও গুরুত্ব দিতে হবে। কখনো কখনো একটা “কি হয়েছে বলো”, একটা “আমি শুনছি”, একটা “তোমার কষ্টটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ”—এই কথাগুলোই একটা সম্পর্ককে ভেঙে যাওয়া থেকে বাঁচিয়ে দিতে পারে।
আমরা অনেক সময় ভাবি, সম্পর্ক ভেঙে গেছে মানেই ভালোবাসা শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু সত্যি হলো, অনেক সম্পর্কেই ভালোবাসা শেষ হয় না—শেষ হয়ে যায় ধৈর্য, শেষ হয়ে যায় অপেক্ষা, শেষ হয়ে যায় বোঝানোর ইচ্ছা। মানুষটা তখনও হয়তো ভালোবাসে, কিন্তু আর কষ্ট পাওয়ার শক্তি থাকে না। আর ঠিক তখনই অভিমান ভালোবাসাকে হার মানিয়ে দেয়।
তাই সম্পর্কের মানুষটা যদি আজও অভিমান করে, অভিযোগ করে, কষ্টের কথা বলে—তাহলে তাকে “নাটক” বা “ঝামেলা” ভেবে দূরে সরিয়ে দিও না। কারণ সে এখনো চায় তুমি তাকে বোঝো, সে এখনো চায় সম্পর্কটা টিকে থাকুক। কিন্তু যেদিন সে একদম চুপ হয়ে যাবে, সেদিন হয়তো আর কিছুই ঠিক করার থাকবে না। কারণ কিছু সম্পর্ক ভাঙে বিশ্বাসঘাতকতায়, কিছু সম্পর্ক ভাঙে দূরত্বে, আর কিছু সম্পর্ক—ভাঙে শুধু জমে থাকা অভিমানে। এমন অভিমান, যা একসময় ভালোবাসাকেও হার মানিয়ে দেয়।
সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।
| 250 SP | 500 SP | 1000 SP | 2000 SP | 5000 SP |
VOTE @bangla.witness as witness
OR
This post has been upvoted by @italygame witness curation trail
If you like our work and want to support us, please consider to approve our witness
Come and visit Italy Community