“কিছু কষ্ট কাউকে বলা যায় না—শুধু বয়ে বেড়াতে হয়”
আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।
মানুষের জীবনে এমন কিছু কষ্ট থাকে, যেগুলো চোখে দেখা যায় না, কিন্তু ভেতরটা প্রতিদিন একটু একটু করে ভেঙে দেয়। পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী বোঝাগুলোর একটি হলো সেই না বলা কষ্ট—যেটা মানুষ নিজের ভেতরে লুকিয়ে রাখে, কাউকে বলতে পারে না, শুধু নীরবে বয়ে বেড়ায়। কারণ সব ব্যথা শব্দে প্রকাশ করা যায় না, আর সব মানুষও সেই ব্যথা বুঝতে পারে না।
আমরা এমন এক সমাজে বাস করি, যেখানে মানুষ আপনার হাসি দেখে বিচার করে আপনি ভালো আছেন কি না। কেউ আপনার চোখের নিচের ক্লান্তি দেখে না, বুকের ভেতরের ঝড়টা অনুভব করে না। অনেক সময় একজন মানুষ বাইরে থেকে স্বাভাবিক, হাসিখুশি, ব্যস্ত—সবকিছু ঠিকঠাক মনে হলেও, ভেতরে সে হয়তো যুদ্ধ করছে নিজের সাথেই। এমন এক যুদ্ধ, যার কোনো শব্দ নেই, কোনো দর্শক নেই, কোনো প্রশংসা নেই। শুধু আছে নিঃশব্দে ভেঙে পড়ার অনুভূতি।কিছু কষ্ট থাকে সম্পর্কের। খুব আপন কেউ বদলে গেলে, বিশ্বাস ভেঙে গেলে, অথবা যাকে নিজের পৃথিবী ভাবা হয়েছিল সে যখন ধীরে ধীরে অপরিচিত হয়ে যায়—সেই কষ্ট সহজে কাউকে বলা যায় না। কারণ মানুষ শুনবে, হয়তো দুটো সান্ত্বনার কথা বলবে, তারপর নিজের জীবনে ব্যস্ত হয়ে যাবে। কিন্তু যার ভেতরে ক্ষত তৈরি হয়েছে, তার জন্য সেই কষ্ট প্রতিদিনের বাস্তবতা হয়ে থাকে।আবার কিছু কষ্ট থাকে পরিবারের দায়িত্ব নিয়ে। এমন অনেক মানুষ আছে, যারা নিজের স্বপ্নগুলো চুপচাপ মাটিচাপা দিয়ে শুধু দায়িত্ব পালন করে যায়। তারা কাউকে বলে না, কতটা চাপ নিয়ে বেঁচে আছে। কারণ তারা জানে—তাদের দুর্বল হওয়ার সুযোগ নেই। পরিবার, সমাজ, দায়িত্ব—সবকিছু মিলিয়ে তারা যেন নিজের অনুভূতিগুলোকে গোপন করেই বড় হয়ে যায়।সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, মানুষ যখন বুঝতে পারে—তার কষ্টের গল্প শোনার মতো সত্যিকারের মানুষ খুব কম। আজকাল সবাই ব্যস্ত, সবাই নিজের সমস্যায় ডুবে। কারও সময় নেই কারও মনটা সত্যি করে বোঝার। তাই অনেকেই একটা সময়ের পর চুপ থাকতে শিখে যায়। তারা আর নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে না। শুধু একটা অভ্যাস তৈরি হয়—“আমি ভালো আছি” বলার, যদিও ভেতরে সবকিছু এলোমেলো।অনেক সময় মানুষ নিজের কষ্ট কাউকে বলতে চায় না বিচার হওয়ার ভয়েও। কারণ সমাজ খুব সহজে দুর্বলতাকে বিচার করে। কেউ কষ্টের কথা বললে তাকে “অতিরিক্ত ইমোশনাল” বলা হয়, কেউ মন খারাপের কথা বললে তাকে “দুর্বল” ভাবা হয়। ফলে মানুষ ধীরে ধীরে নিজের ভেতরেই একটা দেয়াল তৈরি করে নেয়। বাইরে থেকে সে শক্ত, কিন্তু ভেতরে প্রতিদিন একটু একটু করে ক্লান্ত হয়ে যায়।রাতের সময়টা হয়তো সবচেয়ে কঠিন। সারাদিন মানুষ নিজেকে ব্যস্ত রাখে—কাজে, ফোনে, মানুষের ভিড়ে। কিন্তু রাত হলে, চারপাশ শান্ত হয়ে গেলে, নিজের ভেতরের না বলা কথাগুলো আবার ফিরে আসে। পুরোনো স্মৃতি, অপূর্ণতা, কষ্ট, হতাশা—সব যেন একসাথে এসে বসে। তখন কেউ হয়তো চুপচাপ ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে, কেউ গান শুনে, কেউ সামাজিক মাধ্যমে স্ক্রল করে নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু মন তো জানে, সে আসলে কী লুকাতে চাইছে।তবে একটা বিষয় আমাদের বুঝতে হবে—সব কষ্ট একা বহন করাটাও সবসময় সমাধান নয়। কিছু ব্যথা হয়তো ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন, কিন্তু তাই বলে একদম একা হয়ে যাওয়াও ঠিক না। জীবনে অন্তত একজন মানুষ থাকা দরকার, যার সামনে অভিনয় করতে হয় না। যে বিচার করবে না, শুধু শুনবে। সেটা বন্ধু হতে পারে, পরিবারের কেউ হতে পারে, কিংবা এমন কেউ—যার সামনে নিজের ভাঙা দিকটাও নিরাপদ মনে হয়।আর যদি কাউকে বলাও সম্ভব না হয়, তাহলে নিজের অনুভূতিগুলো লিখে ফেলা যেতে পারে। অনেক সময় ডায়েরির পাতা, নিজের সাথে নিজের কথা বলা, অথবা সৃষ্টিশীল কোনো কাজে মন দেওয়া—ভেতরের চাপটা একটু হলেও কমাতে সাহায্য করে। কারণ অনুভূতিগুলোকে একদম চেপে রাখা মানে নিজের ভেতরেই একটা ঝড় জমিয়ে রাখা।তবে এটাও সত্যি, কিছু কষ্ট হয়তো কখনো পুরোপুরি শেষ হয় না। মানুষ শুধু সেই কষ্ট নিয়ে বাঁচতে শিখে যায়। সময় হয়তো সব ঠিক করে না, কিন্তু সময় মানুষকে সহ্য করতে শিখিয়ে দেয়। যে মানুষটা একসময় প্রতিটা রাতে কান্না করত, সেও একদিন হাসতে শেখে—যদিও ভেতরের কিছু ক্ষত রয়ে যায়।আজকাল আমরা অনেক মানুষ দেখি, যারা সবসময় হাসে, সবাইকে আনন্দ দেয়, কিন্তু কেউ জানে না—তারা নিজের ভেতরে কতটা ক্লান্ত। কারণ মানুষ এখন নিজের ভাঙা দিকগুলো লুকাতে শিখে গেছে। সমাজের সামনে সবাই শক্ত থাকার অভিনয় করে। অথচ সত্যিটা হলো—সবচেয়ে শক্ত মানুষগুলোর বুকেও অনেক না বলা কষ্ট জমে থাকে।তাই কখনো কাউকে দেখে সহজে বিচার করা উচিত না। যে মানুষটা হাসছে, সে হয়তো সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছে। যে বলছে “আমি ভালো আছি”, সে হয়তো অনেকদিন ধরেই ভালো নেই। কারণ জীবনের সবচেয়ে গভীর যুদ্ধগুলো অনেক সময় চোখে দেখা যায় না।
শেষে একটা কথাই বলা যায়—“কিছু কষ্ট সত্যিই কাউকে বলা যায় না, শুধু বয়ে বেড়াতে হয়। কিন্তু তবুও মানুষ বেঁচে থাকে, হাসে, এগিয়ে যায়—কারণ জীবন থেমে থাকে না। আর হয়তো এটাই মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি—ভেঙে পড়েও আবার দাঁড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতা।”
সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।
Support @heroism Initiative by Delegating your Steem Power
| 250 SP | 500 SP | 1000 SP | 2000 SP | 5000 SP |
VOTE @bangla.witness as witness
OR