যা পেয়েছি তা অনেক ।

in আমার বাংলা ব্লগlast year

আজ- ২৪ শে বৈশাখ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, গ্রীষ্মকাল


আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।




জীবনে প্রত্যেক মানুষের কিছু না কিছু অপূর্ণতা থাকে। চাওয়া-পাওয়ার এই অনন্ত যাত্রায় মানুষ প্রায়শই তার প্রাপ্তির মূল্য দিতে ভুলে যায়। আমরা অনেক সময়ই ভাবি—“আমার যদি আরও টাকা থাকত”, “আমি যদি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারতাম”, “আমার যদি ভালো পরিবার থাকত”, কিংবা “আমি যদি তার মতো সফল হতাম”—এই না-পাওয়ার তালিকা কখনো ফুরোয় না। অথচ আমাদের হাতে যা আছে, তা নিয়ে আমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি না। প্রতিদিন আমরা যেসব সুযোগ-সুবিধা, ভালোবাসা, ও ছোট ছোট আনন্দ পাচ্ছি—সেগুলোকে আমরা খুব সহজভাবে নিই, যেন এগুলো আমাদের পাওয়ারই কথা। এই মনোভাব আমাদের জীবনকে ধীরে ধীরে অসন্তুষ্টি, বিষণ্ণতা ও হীনম্মন্যতায় ভরিয়ে তোলে।

যা পেয়েছি তা অনেক।.png

আমরা সবসময় অন্যের জীবনের দিকে তাকিয়ে নিজের জীবনকে ছোট মনে করি। একজন বন্ধু নতুন গাড়ি কিনলে, একজন সহপাঠী উচ্চ বেতনের চাকরি পেলে, একজন আত্মীয় বিদেশে চলে গেলে—আমরা অবচেতনভাবে নিজেদের অপূর্ণ মনে করতে শুরু করি। অথচ তারা কি আমাদের সবকিছু জানে? বা আমরাই বা জানি কি তাদের না-পাওয়ার গল্প? কেউই জীবনে সব কিছু পায় না, এবং এটিই বাস্তবতা। জীবন একটি অসম্পূর্ণতার ক্যানভাস, যেখানে প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তি একসাথে পথ চলে। কিন্তু আমরা যখন শুধু না-পাওয়ার ওপর দৃষ্টি দিই, তখন আমাদের মনের চোখে প্রাপ্তির সৌন্দর্য আর ধরা পড়ে না। এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের ধ্বংস করে, আমাদের আত্মবিশ্বাস হরণ করে, এবং জীবনের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি করে।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো তুলনা করা। ছোটবেলা থেকেই আমাদের শেখানো হয়, "সে প্রথম হয়েছে, তুমি পারোনি", "তার নম্বর বেশি, তোমার কম", "সে ভালো চাকরি পেয়েছে, তুমি এখনো বসে আছো"। এই তুলনাগুলো আমাদের মনোজগতে গেঁথে যায়। ফলে আমরা বড় হয়ে উঠেও নিজেদের সবসময় ছোট ভাবতে থাকি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই সমস্যাটিকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। আমরা যখন ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা ইউটিউবে অন্যের সাফল্য দেখি, তাদের জীবনের সুখী মুহূর্ত দেখি, তখন নিজের জীবনের সমস্ত অপূর্ণতা চোখে ভেসে ওঠে। অথচ সেখানে যে ব্যথা, সংগ্রাম, না-পাওয়া, হাহাকার আছে—তা আমাদের চোখে পড়ে না। আমরা কেবল বাহ্যিক চাকচিক্যে বিভোর হয়ে নিজের প্রাপ্তিকে অস্বীকার করি।

প্রকৃতপক্ষে, জীবন একটি আশীর্বাদ। আমাদের যদি দুই হাত, দুই পা, চোখ-কান-নাক, সঠিকভাবে কাজ করে—তাহলে আমরা কতটা সৌভাগ্যবান, তা আমরা কি কখনো ভেবেছি? একজন দৃষ্টিহীন ব্যক্তির কাছে চোখের মূল্য কত? একজন পঙ্গু মানুষের কাছে চলার শক্তি কত বড় প্রাপ্তি? একজন দরিদ্র মানুষের কাছে একটি পাকা ঘর, একটি টিউবওয়েল বা একটি ভালো খাবার কেমন স্বপ্নের মতো? অথচ আমরা এসব কিছু প্রতিনিয়ত উপভোগ করেও তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি না। আমরা ভাবি, “এসব তো আমার পাওয়ারই কথা”, “এগুলো তো সাধারণ”। এই সাধারণ মনে করা জিনিসগুলোর ভেতরেই লুকিয়ে আছে জীবনের বড় বড় আশীর্বাদ।

মানব জীবনে কৃতজ্ঞতা একটি মহৎ গুণ। যে ব্যক্তি কৃতজ্ঞ, তার মন শান্ত, জীবন সরল এবং হৃদয় বিশাল হয়। কৃতজ্ঞ মানুষ তার ছোট ছোট প্রাপ্তিকে নিয়েও খুশি থাকে, অহংকার করে না এবং অন্যের সাফল্য দেখে হিংসা অনুভব করে না। সে নিজের সীমাবদ্ধতা মেনে নেয় এবং যতটুকু পেয়েছে, তার মধ্যে সন্তুষ্ট থাকতে শেখে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা প্রতিদিন অন্তত একটি করে বিষয় লিখে রাখে, যার জন্য তারা কৃতজ্ঞ—তাদের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকে, আত্মবিশ্বাস বাড়ে এবং হতাশা কমে যায়। কারণ কৃতজ্ঞতা মানুষকে জীবনের সৌন্দর্য দেখতে শেখায়।

আমাদের উচিত জীবনে পাওয়া প্রতিটি ছোট ছোট জিনিসের মূল্য দেওয়া। একটি শান্ত বিকেল, মা-বাবার ভালোবাসা, বন্ধুর হাসি, শিক্ষকের পরামর্শ, এমনকি আকাশের তারা দেখা—সবই আমাদের প্রাপ্তির তালিকায় রাখা উচিত। শুধু বড় প্রাপ্তির পেছনে ছুটে গিয়ে ছোট সুখগুলোকে অবহেলা করা উচিত নয়। আমরা যদি প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ভাবি—"আমি আজও বেঁচে আছি, আমি ভালো আছি"—তাহলে জীবনের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যাবে।

এই না-পাওয়ার প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগের ফলে অনেকেই হতাশায় ভুগে, বিষণ্ণতা বাড়ে, আত্মহত্যার চিন্তা পর্যন্ত আসে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম আজকাল এই মানসিক চাপে ভেঙে পড়ছে। তারা মনে করে, "আমার সব বন্ধুই সফল, শুধু আমি ব্যর্থ", অথচ এটা একেবারেই সত্য নয়। প্রত্যেকের জীবনের গতি আলাদা, সময় আলাদা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির ছন্দও ভিন্ন। নিজের জীবনের জন্য অন্যের পথ দেখে চললে, গন্তব্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। তাই নিজের ছোট সাফল্যকেও সম্মান করা শিখতে হবে।

পরিবার, সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান—সবার উচিত শিশুদের ছোটবেলা থেকেই কৃতজ্ঞ হতে শেখানো। যদি আমরা ছোট থেকে শিখি যে—"তোমার যা আছে, সেটিই যথেষ্ট", "অন্যকে দেখে নিজেকে ছোট মনে করো না", "তোমারও আলাদা সৌন্দর্য আছে", তাহলে বড় হয়ে এই প্রজন্ম আত্মবিশ্বাসী, ধৈর্যশীল এবং কৃতজ্ঞ হয়ে উঠবে। শিক্ষা শুধু ডিগ্রি অর্জনের বিষয় নয়, এটি একটি মানসিক চর্চাও। কৃতজ্ঞতা ও প্রাপ্তির স্বীকৃতি সেই শিক্ষারই একটি অন্যতম ধাপ।

জীবনে হয়তো আমরা অনেক কিছু চাই, অনেক কিছু পাওয়ার স্বপ্ন দেখি—এটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই স্বপ্নপূরণ না হলেও আমরা যেন হতাশ না হই। কারণ জীবনের প্রকৃত সাফল্য টাকা, গাড়ি বা চাকরিতে নয়; বরং তা আছে মনের প্রশান্তিতে, সম্পর্কের আন্তরিকতায়, এবং কৃতজ্ঞতার গভীরতায়। আমরা যদি প্রতিদিন আমাদের যা আছে তা স্বীকার করি এবং তার জন্য কৃতজ্ঞ থাকি, তবে জীবন অনেক সহজ, সুন্দর ও সুখকর হয়ে উঠবে।

সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।


Support @heroism Initiative by Delegating your Steem Power

250 SP500 SP1000 SP2000 SP5000 SP

Heroism_3rd.png

VOTE @bangla.witness as witness


witness_vote.png

OR

SET @rme as your proxy

witness_proxy_vote.png

Sort:  
 last year 

জী ভাই মানুষের চাওয়া পাওয়ার শেষ নেই। যত পায় ততই চাহিদা বাড়ে। অল্পতে সন্তুষ্ট মানুষের সংখ্যা খুবই কম। বিশেষ করে আমাদের বাঙালিদের লোভ বেশি, হতাশাও বেশি। তারা শুকরিয়া আদার করতে জানে না। আপনার ব্লগটি পড়ে খুশি হয়েছি।

 last year 

আসলে যে বা যারা অল্পতে সন্তুষ্ট হতে পারে, তারাই প্রকৃত মানুষ। যদিও বর্তমান যুগে এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। তাইতো চারিদিকে শুধু না পাওয়ার হতাশা দেখা যায়। অনেক কিছু থাকা সত্ত্বেও কিছু কিছু মানুষ ভাবে যে কিছুই নেই। আর তারা কখনোই প্রকৃত সুখ পায় না। যাইহোক আমি মনে করি, যেকোনো অবস্থায় মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া আদায় করা উচিত। পোস্টটি আমাদের সাথে শেয়ার করার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে।

Coin Marketplace

STEEM 0.04
TRX 0.33
JST 0.103
BTC 64176.44
ETH 1798.29
USDT 1.00
SBD 0.38