বিকেলগুলো সব একরকম হয় না। কিছু বিকেল আসে— নিঃশব্দে।
আজ -৬য় আষাঢ় | ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | বর্ষাকাল |
আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।
বিকেলগুলো সব একরকম হয় না। কিছু বিকেল আসে— নিঃশব্দে।
সেই বিকেলগুলো আমাদের খুব বেশি কিছু দেয় না, তবুও মনে এমন কিছু রেখে যায়, যেটা দিনের শেষে একাকিত্বে জড়িয়ে থাকে। আজকে ঠিক তেমনই একটা বিকেল।
চা-এর কাপ হাতে জানালার পাশে বসে ছিলাম। জানালার ওপাশে সোনালি আলো পড়ে আছে দেয়ালে, পাখিরা এক এক করে ফিরে যাচ্ছে নীড়ে, আকাশটা একটু একটু করে রঙ বদলাচ্ছে। ভেতরে-বাইরে কোথাও কোনো শব্দ নেই— অথচ এই নীরবতা যেন বুকের মধ্যে ঢেউ তুলে দিচ্ছে।
আমরা প্রতিদিন কত কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকি— সময়, দায়িত্ব, কাজের চাপে হাঁপিয়ে উঠি। কিন্তু মাঝেমধ্যে এমন কিছু বিকেল আসে, যেগুলো সবকিছু থামিয়ে দেয়। আজকের বিকেলটা আমাকে দাঁড় করিয়ে দিল নিজের সামনে। মনে হলো, কতদিন হয়ে গেল নিজের সঙ্গে এক কাপ চা খেয়ে বসা হয় না, নিজের মনকে জিজ্ঞেস করা হয় না— "তুই ঠিক আছিস তো?"
এইসব বিকেলে কারো সঙ্গ দরকার হয় না। দরকার হয় একটু অনুভবের, একটু নিঃশব্দ ভালোবাসার।
কারো পাশে বসে চুপ করে থাকা দরকার হয়— কোনো কথা না বললেও চলবে, শুধু একটু চোখে চোখ রাখা, অথবা একসাথে চুপচাপ বসে থাকা।
শব্দের ভাষা অনেক সময় ভুল বোঝায়, কিন্তু নিঃশব্দতা কখনো ভুল করে না।
আজকে হঠাৎ পুরনো ডায়েরির কিছু পৃষ্ঠা খুলে পড়লাম।
একটা পাতায় লেখা ছিল — "বিকেল মানেই অপেক্ষা।"
তখন বুঝিনি ঠিক কীসের অপেক্ষা। আজ বুঝি, এটা শুধু কারো আসার অপেক্ষা নয়।
অনেক সময় নিজের ফিরে আসারও অপেক্ষা হয়।
যে আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম দৌড়ের মধ্যে, কাজের চাপে, দায়িত্বের ভারে— সেই আমিটাকে খুঁজে পাওয়ার অপেক্ষা।
আমরা অনেকে ভাবি— যাদের ভালোবাসি, শুধু তাদের কাছেই আমাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া থাকে।
কিন্তু না। আমরা নিজের কাছেও চাওয়ার খাতা খুলে বসি প্রতিদিন।
নিজেকে একটু সময় দিতে চাই, একটু বোঝাতে চাই— "তুই অনেক কিছু পারিস, কিন্তু সবকিছু একসাথে না করলেও চলবে।"
আর সেই বোঝানোর সবচেয়ে সুন্দর সময় হচ্ছে, এইসব নীরব বিকেল।
আজ বিকেলে আমি কাউকে মিস করিনি।
কারো জন্য মন খারাপ করিনি।
বরং আজ নিজেকেই একটু জড়িয়ে ধরতে চেয়েছি।
নিজের মনের যতটুকু ক্লান্তি জমে ছিল, সেটা এই সন্ধ্যার আলোয় ভিজিয়ে দিয়েছি।
চুপ করে বসে থেকেছি অনেকক্ষণ— কোনো কথা, কোনো শব্দ ছাড়া।
বিকেলটা ধীরে ধীরে সন্ধ্যায় গিয়ে মিশে গেল।
ঘরটা অন্ধকার হয়ে এলো, কিন্তু আমি বাতি জ্বালালাম না।
এই আধারটাও ভালো লাগে— কারণ এটা চোখে যতটা অন্ধকার, মনের ভেতরে ঠিক ততটাই আলো জ্বেলে দেয়।
আমরা কি আসলেই জানি, কবে শেষবারের মতো মন খুলে কেঁদেছিলাম?
না, আমরা ব্যস্ত হই, হাসি মুখে থেকে যাই, ভেতরের কথা চাপা দেই।
কিন্তু এই বিকেল, এই নীরবতা, এই থেমে যাওয়া— এগুলো আমাদের ভেতরের কান্নাকে অনুমতি দেয় একটু ঝরে পড়ার জন্য।
আর সেটাই শান্তি।
আজ আমি কারো সঙ্গ চাইনি।
চাইনি ফোনে একঘন্টার গল্প, চাইনি চ্যাটে হাসির ইমোজি।
আজ আমি শুধু চেয়েছি একটু নিজের মতো করে থাকতে,
একটু নিজের দিকে ফিরে তাকাতে।
জীবনের সব দিন আনন্দময় হবে না।
সব বিকেল বন্ধুদের আড্ডা, কিংবা প্রিয়জনের সঙ্গে হাঁটার জন্য আসবে না।
কিছু বিকেল একা আসবে—
নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া করার জন্য,
মনকে একটু জিজ্ঞেস করার জন্য—
"তুই কেমন আছিস আজ?"
এইসব বিকেল আমাদের শেখায়—
নীরবতাও একটা ভাষা।
চুপ করে থাকাও একধরনের ভালোবাসা।
এবং সবকিছু থেকে একটুখানি দূরে গিয়ে, নিজেকে ভালোবাসাও একটা প্রয়োজন।