শৈশব জীবনের সবচাইতে অমূল্য অধ্যায়।
এই! এখানে কেনো এসেছো? দেখছো না বড়োরা কথা বলছে? যাও বড়োদের কথার মাঝে থাকতে নেই!
কতবার মাকে খুঁজতে গিয়ে কথাটা শুনতে হয়েছে।
মনে মনে তখন দুটো কথা ভাবতাম, আমিও যখন বড়ো হবো, এই একই কথা বলবো।
আর একটা ভাবনা ছিল, বড়োরা কি এমন কথা বলে? যেখানে ছোটদের থাকতে নেই!
আমার মত এমন অভিজ্ঞতা হয়তো শৈশবে অনেকেরই হয়েছে।
তখন কবে বড়ো হবো সেইদিন গুনতাম!
আর, এখন বড়ো হয়ে বুঝতে পারি, আসলে শৈশবটাই জীবনের সবচাইতে অমূল্য অধ্যায় ছিল।
তখন ভাবতাম, বড়োদের কেউ বকে না, পড়াশুনার কথা বলে না, কোথায়, কখন যাবে সেটা বলে যাবার প্রয়োজন নেই, আবার ফিরতে দেরি হলে বকা শুনতে হয় না ইত্যাদি ভালো দিক গুলো খুঁজে খুঁজে বের করতাম।
এদিকে আমার বেলায়, সন্ধ্যে না ঘনাতেই ঘরে ফিরতে হবে, নইলে মায়ের বকুনি শোনার ভয়, আবার টিভি দেখার অনুমতি নির্দিষ্ট সময়, নির্দিষ্ট অনুষ্ঠান দেখার ক্ষেত্রেই ছিল।
এ আবার কেমন কথা? তাদের বেলায় সব কিছুতে ছাড়, আর আমার বেলায় যত নিয়ম?
এ ভারী অন্যায়!
আমার দিদি এসমস্ত ভাবনার বাইরে ছিল, কারণ সারাক্ষণ মায়ের আঁচলের তলায় থাকায় বিশ্বাসী ছিল, না খেলাধুলা আর না কোনো দুষ্টুমি, কেবলমাত্র পড়াশুনা।
এমনকি, যেই না খেলা জমে উঠেছে, ওমনি বনু... বনু....বনু.... ডাক পড়ে যেত!
এসে যখন জানতে চাইতাম ডাকার কারণ, উত্তর আসতো..
দিদি:- না, তোকে অনেকক্ষণ দেখি না তো তাই!
আমি:- দিলি তো খেলা পণ্ড করে! নিজেও খেলবি না, আর আমাকেও খেলতে দিবি না!
দিদি:- আচ্ছা যা, তাড়াতাড়ি ফিরে আসিস আমি একা একা বসে আছি, ভালো লাগছে না।
তখন মনে হতো, কে বলেছে একা বসে থাকতে, খেললেই পারিস!
বিকেল হলে কেউ এইভাবে বারান্দায় বসে থাকে নাকি!
বিকেল মানেই তো খেলা।
তারপর বেশিরভাগ দিন রক্তাক্ত হয়ে (কমপক্ষে ১০ বার ডান আর বা পায়ের বুড়ো আঙুলের নখ গোড়া থেকে উপরেছে)সন্ধ্যায় ফিরলে সেই দিদি আমাকে মায়ের বকুনি খাবার হাত থেকে বাঁচিয়েছে বহুবার।
কত নালিশ আড়াল করেছে, কত দোষ নিজের ঘাড়ে নিয়েছে, আবার আমার প্রাপ্য মার খেয়েছে আমার হয়ে।
আমি তো ধরা ছোঁয়ার বাইরে, প্রতিবেশী কোনো জেঠিমা, মামিমার বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে নিজেকে মারের হাত থেকে বাঁচিয়ে নিয়েছি;
বাবা গিয়ে সাদরে ডেকে আনলে ফিরেছি ঘরে।
বাড়িতে ঢোকার পড়ে শান্ত স্বরে দিদির অভিযোগ, নিজে তো পালিয়ে বেঁচে গেলি, তোর মার আমাকে খেতে হলো।
তখন তো নিজেকে বিরাট বড়ো হনু ভাবতাম, আর মনে মনে হাসাতাম, তুই পালাতে পারিস না, সেটা কি আমার দোষ!
তবে আমার শৈশব ছিল খুব কম সময়ের জন্য, আর মায়ের অকাল প্রয়াণের পরে, আমার দিদির একটা ভিন্ন রূপ দেখেছিলাম।
তখন আমার ছুটি আগে হতো, আর দিদির পরে। দুজনেই স্কুলে পড়ি, আমি ফিরে কখনো বারান্দায়, আবার কখনো জানালার ধারে দিদির পথ চেয়ে বসে থাকতাম।
বারান্দায় বসে গলির বাঁক এর দিকে চেয়ে থাকতাম, যেই দিদির মুখ দেখতে পেতাম এক ছুটে পৌঁছে যেতাম তার কাছে।
ওইটুকু রাস্তা পাড়ি দেবার ধৈর্য্য ধরে রাখতে পারতাম না।
পৌঁছে প্রথম প্রশ্ন, দিদি আজ কি এনেছিস আমার জন্য?
একমুখ হাসি নিয়ে কখনো পছন্দের খাবার, আবার কখনো রং বেরংয়ের চুড়ি কিনে নিয়ে আসত আমার জন্য।
সময়ের আগেই বেড়ে ওঠা দুটো প্রাণ। শৈশবের মানে বোঝার আগেই বাস্তবের থাবা এসে পড়ে যাদের জীবনে;
আমার মনে হয়, তারাই আসলে সময়, সম্পর্ক, এবং শৈশবের প্রকৃত মানে বোঝে।
কতো মানুষের হয়তো আরো ভয়ঙ্কর শৈশব আছে, কেউ তাদের কথা বলে আর কেউ বলেনা এই যা পার্থক্য।
তবে, না বোঝা সময়টাই বোধহয় সবচাইতে ভালো, কারণ ভালো না লাগলে নির্লজ্জের মত জানিয়ে দেওয়া, কেঁদে কেঁদে নিজের পছন্দের জিনিষ আদায় করে নেওয়া যায়।
অসময়ে যখন সময়ের সবকিছু মানিয়ে নিতে হয়, তার যন্ত্রণা ভাষায় ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।
একসময় যাকে খেলার মাঝে ডাকলে বিরক্ত হতো, তাকেই পরে খেলার জন্য ডাকতে হতো।
একসময় পড়াশুনা আর খেলা ছাড়া যার মাথায় কিছুই থাকতো না, তাকে ঘরের কাজ সেরে তবেই স্কুলে যেতে হতো।
জীবনের কোন্ সকাল কার জন্য, কি বয়ে আনবে সেটা কারোর জানা নেই, তাই প্রতিটি মুহূর্তকে সানন্দে অতিবাহিত করা উচিত।
আমি জীবনে একটা শিক্ষা পেয়েছি, এবং উপস্থিত সকল বন্ধুদের বিশেষত যাদের সন্তান আছে তাদের উদ্দেশ্য বলতে চাই, নিজেদের সন্তানকে শৈশব উপভোগ করতে দিন।
কাল আমাদের জন্য কি অপেক্ষা করছে সেটা আমাদের কারোর জানা নেই, আর জানবেন জীবনের যা কিছু পুনরাবৃত্তি করা সম্ভব নয়, সেটা যথা সম্ভব উপভোগ করা এবং করতে দেওয়া উচিত;
শৈশব তাদের মধ্যে অন্যতম।
আজকে আড়াই মাস বাদে সেই দিদির সাথে কথা হলো, সাথে সাথে চোখের সামনে শৈশবের দিনগুলো ভেসে উঠলো।
আজকে তাই কথার শেষে এখনের কিছু ছবি পাঠাতে বললাম দিদিকে, অন্ততপক্ষে সেগুলো কিছুদিন শৈশবের রসদ যোগাবে, আর তো কেউ নেই দিদি ছাড়া।
আপনাদের সাথেও আমার শৈশব আর শান্ত শিষ্ট দিদির ছবিগুলো ভাগ করে নিলাম, ছেলেবেলার কিছু ঘটনার সাথে।
আমি আজও নিজের শৈশব খুঁজে বেড়াই শিশুদের মাঝে, তখন আমি মনে রাখি না আমি বড়ো হয়ে গেছি।
কিছু সময়ের জন্য নাই বা মনে রাখলাম, কি যায় আসে তাতে? নিজের মন আর মাথাকে মাঝেমধ্যে বোকা বানাতে আমার বেশ ভালো লাগে, আর সেই ভালো লাগাকে সঙ্গী করে আগামী পথ চলি, এটাই আমার একাকীত্বের মাঝে নিজেকে ভালো রাখার রহস্য।
আপনার পোষ্টের,,,, প্রথম দিকটা পড়তে পড়তে হাসতে শুরু করলাম! আসলে আমি পোস্ট পড়ছিলাম আর হাসছিলাম।
আপনার দিদি আপনাকে খুব ভালোবাসত! যার কারণেই হয়তো আপনার দুষ্টুমির বিষয়গুলো উনি লুকিয়ে রাখত,,,, এবং নিজেই আপনার জন্য মার খেত।
আসলে আমার কোন বড় বোন বা ছোট বোন নেই! আমি একাই তো ছোটবেলার সবকিছু একাই সহ্য করতে হয়েছিল! আপনার ছোটবেলার কথাগুলো পড়তে গিয়ে,,,, আমার ছোটবেলার কথা গুলো মনে পড়ে গেল।
কিন্তু আপনার পোষ্টের শেষে এসে দেখলাম! আপনি কিছু কথা উল্লেখ করেছেন! আসলে মানুষের জীবনের একটা সেকেন্ড খুব মূল্যবান,,,, কারণ এক মিনিট পরে কি হবে সেই ধারণা আমি বা আপনি কেউই দিতে পারব না! জীবনে যতটুকু সময় আছে উপভোগ করা,,,,, প্রত্যেকটা মানুষের ক্ষেত্রেই প্রয়োজন।
কারন আমরা এখন বেঁচে আছি ১০ মিনিট পরে বেঁচে থাকব! এর নিশ্চয়তা আমরা কেউ দিতে পারি না! আপনার মাকে হারিয়েছেন,,, আপনার দিদি আপনার মায়ের মত করে আপনাকে যত্ন করে আগলে রেখেছে! আপনার দিদির জন্য আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি! তিনি যেন সবসময় ভালো থাকে! আপনার জন্য অনেক অনেক শুভকামনা রইল! ভালো থাকবেন।
@sduttaskitchensir অসাধারন লিখুনী আপনার।
পোস্ট টি পড়তে ছিলাম আর মনে হচ্ছিল, আমার মনের কথা গুলি ই আপনি যেন ব্যক্ত করেছেন। আমার ছোট বোনের জন্য ও আমাকে মায়ের অনেক বকুনি খেতে হতো আর ওকে মায়ের হাত থেকে রক্ষা করতাম। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আমাদের সাথে এত বাস্তবধর্মী একটি পোস্ট শেয়ার করার জন্য।
আমার ছোট বোন ও আমার সম্পর্ক অনেকটাই এমন। খুব ভালো লিখেছেন দিদি।