কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবিরে নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধিদল

in #lifestyle8 years ago

4da67f9617770d02bdce15e8b9204023-5ae55c41377f9.jpg

তিন দিনের সফরের দ্বিতীয় দিনে আজ রোববার সকালে কক্সবাজারে কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবির পরিদর্শন করেছে নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধিদল।

৪০ সদস্যের দলটি গতকাল শনিবার বাংলাদেশে আসে। আজ তারা প্রথমে শূন্যরেখায় যায়। সেখানে গিয়ে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে। পরে কুতুপালং শিবির পরিদর্শনে যায়।

বাংলাদেশ সফরে আসা নিরাপত্তা পরিষদের এ দলের কাছে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জোরালো পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ। তিন দিনের সফরের প্রথম দিনে গতকাল বিকেলে কক্সবাজারে পৌঁছানোর পর নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধিদলটি হালনাগাদ পরিস্থিতি বুঝতে বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসে। সে সময় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এই অনুরোধ করা হয়।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধিরা রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখার আশ্বাস দিয়েছেন। জাতিসংঘে পেরুর স্থায়ী প্রতিনিধি এবং চলতি মাসে নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতি গুস্তাভো মেজা সুয়াদ্রা প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

গতকাল বিকেলে কক্সবাজারে ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রসচিব রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) মো. খুরশেদ আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তিনটি বিষয়ে আলাদা উপস্থাপনা তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে প্রথাগত ও অপ্রথাগত নিরাপত্তা বিষয়ে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের পক্ষে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুনিরুল ইসলাম আখন্দ, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার আবুল কালাম এবং প্রত্যাবাসনের পরিপ্রেক্ষিতে অধিকার ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অনুবিভাগ) তারেক মোহাম্মদ প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধিদের ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম। প্রতিনিধিদলের এক প্রশ্নের উত্তরে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে মিয়ানমারের ওপর চাপ দেওয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, মিয়ানমারে গণতন্ত্র এলে রোহিঙ্গা পরিস্থিতির উন্নতি আশা করেছিল বাংলাদেশ। রাখাইনে রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতিকে অস্বীকার যে কারও জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে না, সেটিও তিনি উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে গতকাল আলোচনায় বসার আগে নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধিদলটি জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারীর সঙ্গে একটি বৈঠক করে। নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলোচনার সময় আজ ১৪ দফা দাবি তুলে ধরবে রোহিঙ্গারা। আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের প্রধান মহিবুল্লাহ গত শুক্রবার প্রথম আলোকে এ তথ্য জানিয়েছিলেন। সম্প্রতি মিয়ানমারের মন্ত্রীর সফরের সময় এই সংগঠনটি বিক্ষোভ দেখিয়েছিল। মন্ত্রীর সঙ্গে তারা মতবিনিময়ও করেছিল। সংগঠনটির দাবির মধ্যে রয়েছে মিয়ানমারে তাদের নাগরিকত্ব দিয়ে ফেরত নেওয়া, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষীদের মাধ্যমে একটি নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠা। এ ছাড়া তারা ২০১৬ সালের অক্টোবর থেকে সহিংসতায় নিহত, আহত ব্যক্তিদের একটি তালিকা দিতে যাচ্ছে। নিরাপত্তা পরিষদের জন্য তৈরি ওই প্রতিবেদনে ১০ হাজার ৫০০ রোহিঙ্গা নিহত, ৯৬০ জন আহত, ১ হাজার ৮৩৪ জন ধর্ষণের শিকার আর ৮৬টি গণকবরের উল্লেখ করা হয়েছে।

গতকাল বিকেল সাড়ে চারটার দিকে নিরাপত্তা পরিষদের ৪০ সদস্যের প্রতিনিধিদলটি কুয়েত থেকে বিশেষ ফ্লাইটে কক্সবাজারে পৌঁছায়। বিমানবন্দরে তাদের স্বাগত জানান ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রসচিব রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) মো. খুরশেদ আলম। নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও চীন ছাড়া অস্থায়ী ১০ সদস্যের মধ্যে নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, পোল্যান্ড, কুয়েত, বলিভিয়া, পেরু, কাজাখস্তান, ইথিওপিয়া ও গিনির প্রতিনিধিরা বাংলাদেশে এসেছেন। আইভরি কোস্টের স্থায়ী প্রতিনিধি সম্প্রতি মারা যাওয়ায় সে দেশের কোনো প্রতিনিধি আসেননি। দলের অন্যরা হলেন জাতিসংঘের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা।

আলোচনার যত প্রসঙ্গ
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সর্বশেষ পরিস্থিতি, বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর রোহিঙ্গাদের নিয়ে ভাবনা, বর্ষা মৌসুম নিয়ে বাংলাদেশের পরিকল্পনা ইত্যাদি নানা প্রসঙ্গে জানতে চেয়েছেন নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধিরা। তা ছাড়া আলোচনায় সবাই বাংলাদেশের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন।

রাশিয়ার প্রতিনিধির প্রশ্ন ছিল, শুরুতেই বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ রোহিঙ্গাদের নানাভাবে সাহায্য করেছে। দীর্ঘ আট মাস তারা এখানে থাকায় স্থানীয় জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের কীভাবে দেখছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, স্থানীয় লোকজন এখনো রোহিঙ্গাদের বিষয়ে সহানুভূতিশীল। তবে লোকজনের ওপর চাপ বাড়ছে।

চীনের প্রতিনিধি বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সই হওয়া দ্বিপক্ষীয় চুক্তির অগ্রগতি জানতে চান। এখন পর্যন্ত যেসব অগ্রগতি হয়েছে, সেটি উল্লেখ করেন বাংলাদেশের কর্মকর্তারা। একপর্যায়ে চীন এ সমস্যা সমাধানে দুই দেশকে নিয়ে তিন ধাপে সমাধানের বিষয়ে তাঁর দেশের আগের প্রস্তাব উল্লেখ করেন।

যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশকে কীভাবে ভবিষ্যতে সহযোগিতা করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করেন। এ সমস্যা সমাধানে তাঁরা অব্যাহতভাবে বাংলাদেশকে সহযোগিতার কথা বলেন।

অস্থায়ী এক সদস্যদেশের প্রতিনিধি জানতে চান, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে যে ঘৃণাবোধ রয়েছে, তা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে একটি বড় অন্তরায়। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, রাখাইনের সমাজে এই সংকট দূর করতে মিয়ানমারের সরকারকেই দায়িত্ব নিতে হবে।

আলোচনার শেষ পর্যায়ে বাংলাদেশের এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধিদলকে বলেন, প্রতিবেশীর সংকটে বাংলাদেশ দুয়ার খুলে দিয়ে বিপন্ন জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়েছে। তাই বলে সমস্যার দায় যেন বাংলাদেশের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া না হয়। এটি ঘটলে ভবিষ্যতে প্রতিবেশীর সংকটে কেউ সীমান্ত খুলে দেবে না।

এ বছরের শুরু থেকেই নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধিদলের বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সফরের কথা ছিল। নিরাপত্তা পরিষদ ফেব্রুয়ারিতে সফর আয়োজনের প্রস্তুতি নিলেও মিয়ানমারের সাড়া না পাওয়ায় তা শেষ পর্যন্ত হয়নি। বেশ কয়েকবার অনুরোধ জানিয়েও মিয়ানমারের সাড়া না পাওয়ায় নিরাপত্তা পরিষদ প্রয়োজনে শুধু বাংলাদেশ সফর করার কথাও ভেবেছিল। ওই সময় বাংলাদেশ বলেছে, ফলপ্রসূ সফর করতে হলে নিরাপত্তা পরিষদকে দুই দেশেই যাওয়া উচিত। তা ছাড়া মিয়ানমারে প্রতিনিধিদল না গেলে বিষয়টিকে দেশটি ইস্যু বানানোর চেষ্টা করবে। শেষ পর্যন্ত মিয়ানমার সম্মতি দেওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ এই সফর হচ্ছে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন
গতকালের বৈঠকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সর্বশেষ অগ্রগতির পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়েছে, ২০০৫ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত তিন লাখের মতো অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা আগে থেকে বাংলাদেশে অবস্থান করছিল। ২০১৬-এর অক্টোবর থেকে পরের বছরের আগস্ট পর্যন্ত ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। আর ২৫ আগস্টের পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে। এখনো রোহিঙ্গারা অল্প আকারে পালিয়ে আসছে এবং বাংলাদেশ তার সীমান্ত খোলা রেখেছে। বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক করা হয়ে গেছে এবং তাদের বসবাসের জন্য সরকার ৫ হাজার ৮০০ একর জায়গা দিয়েছে। বৈঠকে বলা হয়, পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ শরণার্থীশিবির কুতুপালংয়ে এখন সাড়ে ৫ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে।

বাংলাদেশ গতকাল বলেছে, মানবাধিকারের শর্তগুলো মেনেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন হবে। আর মিয়ানমারের লোকজনের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াটা হবে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত। এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা জড়িত হয়েছে। বাংলাদেশ এ সমস্যার টেকসই প্রত্যাবাসন চায়।

Sort:  

Congratulations! This post has been upvoted from the communal account, @minnowsupport, by r-n from the Minnow Support Project. It's a witness project run by aggroed, ausbitbank, teamsteem, theprophet0, someguy123, neoxian, followbtcnews, and netuoso. The goal is to help Steemit grow by supporting Minnows. Please find us at the Peace, Abundance, and Liberty Network (PALnet) Discord Channel. It's a completely public and open space to all members of the Steemit community who voluntarily choose to be there.

If you would like to delegate to the Minnow Support Project you can do so by clicking on the following links: 50SP, 100SP, 250SP, 500SP, 1000SP, 5000SP.
Be sure to leave at least 50SP undelegated on your account.

Coin Marketplace

STEEM 0.05
TRX 0.33
JST 0.079
BTC 63469.67
ETH 1683.58
USDT 1.00
SBD 0.41