ভিড়ের মধ্যেও একা থাকার নামই তো শহর
আজ - ২৯ শে শ্রাবণ | ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | বর্ষাকাল |
আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।
শহরের সকাল মানেই ব্যস্ততা। ক্লান্ত চোখে ঘুম ভাঙা, এলোমেলো চুলে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখটা চিনে নেওয়া, তারপর দৌড়। অফিসের জন্য, ক্লাসের জন্য, দায়িত্বের জন্য, না-পারার পরও সব সামলে রাখার জন্য। প্রতিদিন সকালটা শুরু হয় একইভাবে, যেন সময় এক নিখুঁত ছকে বাঁধা — কিন্তু মনের ভেতরটা ঠিক তেমন গুছানো থাকে না কখনো।
আজকের সকালটাও ছিল ঠিক সেরকমই। ঘড়ির কাঁটা তাড়া দিচ্ছিল, আমি ছুটছিলাম। অফিসের কাজ, মিটিং, ইমেইল, কল—সব কিছুই চলছিল ঠিকঠাক। কিন্তু মাথার ভেতর যেন কোথাও একটা খালি জায়গা রয়ে গেছে, যা কোনো কাজেই পূরণ হচ্ছিল না। ভিড়ের মধ্যে থেকেও যেন আমি একা, চুপচাপ, অদৃশ্য।
শহর এক অদ্ভুত জায়গা। এখানে হাজারো মানুষ একসঙ্গে হাঁটে, বাসে-ট্রেনে ওঠে, দোকানে চা খায়, কিন্তু কেউ কাউকে চিনে না। কেউ কারো খোঁজ রাখে না। কেউ কথা বলে না, শুধু চোখে চোখ পড়ে — তারপর সবাই আবার নিজের গন্তব্যে ছুটে যায়। আমি প্রতিদিন এই শহরেরই একজন। কিন্তু আজ আমার চারপাশের এই নিঃসঙ্গতা যেন আরও বেশি করে গায়ে লেগে গেছে।
আজ বিকেলে অফিস শেষে বাসায় ফিরছিলাম। বাসের জানালার পাশে বসে বাইরে তাকিয়ে ছিলাম। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা একজন বৃদ্ধ লোক, হাতে ছেঁড়া ব্যাগ, মুখে ক্লান্তির রেখা। তাঁর সামনে অনেক মানুষ হেঁটে যাচ্ছিল, কেউ ফিরেও তাকাচ্ছিল না। তাঁরও চোখে কোনো আশা ছিল না — যেন অভ্যস্ত হয়ে গেছেন এই অদৃশ্য হয়ে থাকার অভিজ্ঞতায়। তখন বুঝলাম, শুধু আমি একা না, এই শহরের প্রতিটা মানুষই ভেতরে ভেতরে একা। কেউ কাউকে বলার সুযোগ পায় না, কেউ শুনতেও চায় না।
বাসায় ফেরার পথে একটা চায়ের দোকানে দাঁড়ালাম। গরম চায়ের কাপ হাতে নিয়ে ভিজে রাস্তাটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। রাস্তায় মানুষ ছুটছে, বৃষ্টি থেমে গেছে কিছুক্ষণ আগে। একপাশে ছাতা হাতে একজন যুবক দাঁড়িয়ে ছিল, কাঁধে অফিস ব্যাগ। চোখে ক্লান্তি, মুখে কিছু না বলা কথা। আমাদের মধ্যে কোনো কথা হয়নি, কিন্তু সেই নীরবতার মধ্যেও যেন একটা অনুভব ছিল — যে এই মুহূর্তে আমরা দুজনেই বুঝতে পারছি, আমরা ঠিক কেমনভাবে একা।
আমাদের জীবনে এমন অনেক সময় আসে, যখন কথাগুলো গলার কাছে এসে থেমে যায়। কিছু সম্পর্ক থাকে, যেগুলো ভেঙে না গিয়ে হারিয়ে যায়। কিছু মানুষ চলে যায়, কিন্তু স্মৃতি রেখে যায়। আর এই স্মৃতিগুলোই আমাদের দিনের শেষে আরো একটু নিঃসঙ্গ করে তোলে।
কখনো কখনো নিজের সাথেই কথা বলতে ইচ্ছে করে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে—"সব ঠিক আছে তো?" কিন্তু উত্তরটা কেউ শোনে না, শুধু আমরা জানি — হয়তো ঠিক নেই। এই শহর, এই জীবনের চাপে আমরা এতটাই যান্ত্রিক হয়ে গেছি যে, মনের কথা বলার মতো একটা সময়ও আর থাকে না।
বন্ধুরা ব্যস্ত, পরিবার দূরে, নিজের সাথে দেখা করাও যেন একটা প্ল্যান করতে হয়। তাই তো মাঝে মাঝে মনে হয়, এই একাকীত্বটাই এখন জীবনের সঙ্গী। এই শহরের রাস্তায়, চায়ের দোকানে, ছাদে, অথবা অফিস ডেস্কে — আমরা সবাই একেকজন নিরব দর্শক। বাইরে আমরা শক্ত, হাসিখুশি, পরিপাটি। কিন্তু ভেতরে আমরা ক্লান্ত, প্রশ্নে ভরা, এবং প্রচণ্ড একা।
তবুও জীবন থেমে থাকে না। ভোর হবে, আবার ব্যস্ততা শুরু হবে। আবার আমরা মুখে হাসি নিয়ে ছুটবো সময়ের পেছনে। কেউ জিজ্ঞেস করবে না কেমন আছি, আমরাও বলব না কিছু। শুধু একেকটা দিন পার হবে, একেকটা মুহূর্ত জমা হবে আমাদের ভেতরে — কোনো শব্দ ছাড়াই।
আজকের এই একাকীত্ব আমাকে মনে করিয়ে দিল, জীবনে সবচেয়ে বেশি দরকার একটা বোঝার মানুষ। যে না থাকলেও ঠিক বোঝে। যে প্রশ্ন করে না, শুধু পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। শহরের ভিড়েও যে কাউকে না কাউকে এমন একজন মানুষ চাই — যে চোখে চোখ রেখে বলবে, “আমি বুঝি, তুই একা না।”
This post has been upvoted by @italygame witness curation trail
If you like our work and want to support us, please consider to approve our witness
Come and visit Italy Community