ফটোগ্রাফি পোস্ট- "সোনাগাঁও জাদুঘরের কিছু নান্দনিক ফটোগ্রাফি"
আসসালামু আলাইকুম
কেমন আছেন সবাই ? আশা করি আপনারা সবাই বেশ ভালো আছেন। চলে গেল ঈদ। সেই সাথে চলে গেল পবিত্র রমজান মাস। আবার এক বছর পর আমরা ফিরে পাবো এই রমজান মাস। জানিনা কে কতটুকু নিজেকে পরিশুদ্ধ করে নিতে পেরেছি। যাই হোক প্রতিদিনের মত করে আজও চলে আসলাম আপনাদের মাঝে আমার আরও কিছু ফটোগ্রাফি শেয়ার করার জন্য। আসলে চলতে ফিরতে এত এত ফটোগ্রাফি করেছি যে প্রতিটি ফটোগ্রাফি আমার মোবাইলে জমে একেবারে মোবাইল কে হ্যাংঙ করে দিয়েছে। এই ফটোগ্রাফি করে শেষ হবে কে জানে।
আমার কাছে ফটোগ্রাফি করা একটি আর্ট। আর সেই ফটোগ্রাফি যদি করা যায় মনের মনের মাধুরী মিশিয়ে তাহলে কিন্তু ফটোগ্রাফি হয়ে উঠে বেশ আকর্ষনীয় এবং দৃষ্টিনন্দন। অবশ্য সবার পক্ষে সুন্দর সুন্দর ফটোগ্রাফি করা হয়ে উঠে না। তবে আমরা যদি ক্যামেরার লেন্স এবং ফোকাস বুঝে একটু সময় নিয়ে ফটোগ্রাফি করতে পারি তাহলে কিন্তু আমরাও একজন দক্ষ ফটোগ্রাফার হতে পারবো। আর নিজেদের দক্ষতাকে সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলতে পারবো। তাই আমাদের উচিত হবে সুন্দর এই শিল্পটিকে সুন্দর করে শিখে নেওয়া।
যেদিন সোনারগাঁ জাদুঘরে গিয়েছিলাম, সেদিনটা আমার স্মৃতির পাতায় চিরস্থায়ী হয়ে রয়ে গেছে। যদিও সোনারগাঁ সম্পর্কে আগেও অনেক কথা শুনেছিলাম, কিন্তু সেখানে গিয়ে নিজের চোখে দেখা যে অভিজ্ঞতা, তা সত্যিই অতুলনীয়। প্রাচীন বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি আর শিকড়ের যে মায়াবী রূপ আমি সেদিন দেখেছি, তা আজও চোখে ভাসে। জাদুঘরের ভেতরের চেয়ে বাইরে যেন আরও বেশি আকর্ষণীয় এক জগৎ লুকিয়ে ছিল। সেদিন ঘুরে ঘুরে যা যা দেখেছিলাম, তার প্রতিটা মুহূর্ত আমাকে বারবার ফিরে যেতে ডাকছে।
প্রথমেই চোখে পড়েছিল মাটি দিয়ে তৈরি বিশাল গরুর গাড়ী। এটা কোনো সাধারণ প্রদর্শনী নয়, বরং আমাদের পল্লী বাংলার প্রতিচ্ছবি। সেই গাড়ীর গায়ে হাত বুলিয়ে একটা অন্যরকম অনুভূতি হয়েছিল, যেন বহু বছর আগেকার কোনো চেনা সময়কে ছুঁয়ে দেখছি। আগে কখনো এত কাছ থেকে, এত জীবন্তভাবে ঐতিহ্যের প্রতিফলন দেখিনি। গরুর গাড়ীর চাকা, তার কাঠামো, আর সামনের কাঠের তৈরি ছাউনি সবই এত নিখুঁতভাবে তৈরি করা ছিল যে মনে হচ্ছিল, এ যেন ইতিহাসের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এক জীবন্ত স্মারক। এই গাড়ীগুলো কেবল পরিবহনের মাধ্যম ছিল না, বরং মানুষের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। চলতে চলতে পৌঁছে গিয়েছিলাম এক পুরনো ঘরের সামনে। মাটির তৈরি বারান্দা, সামনে রাখা ডেকি, পাশে রাখা মাটির পাতিল, পেছনে একটা খোলা উঠান—সবকিছু এত বাস্তব মনে হচ্ছিল যে যেন সত্যি কোনো গ্রামীণ জীবনের টুকরো আমার সামনে হাজির। সেখানকার নিস্তব্ধতা আর ছায়াঘেরা পরিবেশে দাঁড়িয়ে অনুভব করলাম, এ শুধু একটা ঘর নয়, এটি যেন একটি জীবনযাত্রার চিত্রপট। গ্রামের বাড়িতে যেমন সকালের শুরু হতো ডেকিতে চাল ভাঙার শব্দ দিয়ে, সেই দৃশ্য যেন সামনে বাস্তব হয়ে ফুটে উঠলো। বারান্দার এক কোণে পড়ে থাকা একটা পুরনো খুন্তি কিংবা কুলার মতো বস্তু দেখেও কতশত গল্প মনে পড়ে গেল।
আমাদের পূর্বপুরুষরা যেভাবে একটুখানি মাটি, একটু খড় আর পরিশ্রম দিয়ে জীবনের রঙ তৈরি করতেন, সেই জীবন এখন কেবল স্মৃতি। কিন্তু সোনারগাঁয়ে এসে সেই স্মৃতিকে আবার যেন ছুঁয়ে দেখা গেল। সেই পুরনো দিনের ঘরের চারপাশে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল আমি যেন সেই অতীত জীবনের অংশ হয়ে গেছি। প্রকৃতির সহজ সৌন্দর্য আর মানুষের অকৃত্রিম জীবনযাপন যেন চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। এরপর সামনে পড়লো একটা বিশাল পুকুর, যার পাড়ে রাজকীয় ঘাট তৈরি করা। ঘাটে বসে যেন অনুভব করছিলাম, কত শত বছর আগে এখানে কেউ বসে পায়ের জল ছুঁয়ে ভাবছিলো তার জীবন, তার সময়, কিংবা কোনো প্রেমের কবিতা। পুকুরের জলে চারপাশের পুরনো গাছের ছায়া পড়ছিলো, আর বাতাসে ভেসে আসছিলো পাখির ডাক। এই পরিবেশে দাঁড়িয়ে সময় যেন স্থির হয়ে গেলো। চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ বসে থাকলাম ঘাটের পাথরের সিঁড়িতে। যেন ইতিহাস নিজে এসে পাশে বসে গল্প বলছে।
এরপরে দেখলাম রাজা-বাদশাদের ব্যবহার করা কিছু বস্তু এবং তাদের স্থাপনার ভিত্তি। দেয়ালে খোদাই করা নকশা, ভাঙা দরজা, ছাদের ধ্বংসাবশেষ—সবই সাক্ষ্য দিচ্ছে এক রাজকীয় সময়ের। মনে হচ্ছিল, আমি হয়তো কোনো গল্পের মধ্যে হেঁটে চলেছি। একসময় এই জায়গায় রাজা-বাদশারা হাঁটতেন, প্রজাদের কথা ভাবতেন, যুদ্ধ আর রাজনীতি নিয়ে পরামর্শ করতেন। তখনকার সময়ের একটুখানি অংশের ওপর দাঁড়িয়ে আমি যেন এক গভীর শ্রদ্ধায় নত হয়ে গেলাম। ইতিহাস কখনো শুধু বইয়ের পাতায় থাকে না, কখনো কখনো সে নিজেই চারপাশে ঘুরে বেড়ায়, ঠিক যেমনটা সেদিন ঘটেছিল। জাদুঘরের পাশে আরও কিছু লোকজ উপস্থাপনাও ছিল যা আমাকে মুগ্ধ করেছে। মাটির তৈরি হাঁড়ি, পাতিল, কলস, ডালা-বাটি—সব কিছু এত নিখুঁতভাবে সংরক্ষিত ছিল যে দেখে মনে হচ্ছিল, এগুলো যেন এখনো ব্যবহার হচ্ছে। প্রতিটা জিনিসের গায়ে যেন মানুষের স্পর্শ লেগে ছিল। কতজন মা এই পাতিলে ভাত রান্না করেছেন, কতজন শিশু এর পাশে বসে খেলা করেছে, কত পরিবার একসাথে বসে খেয়েছে—এই সব ভাবনা আমাকে একধরনের নস্টালজিয়ায় ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। এত সাধারণ কিন্তু এত গভীর আবেগ জড়িয়ে এই জিনিসগুলোর সাথে।
জাদুঘরের ভেতরের সংগ্রহগুলোও ছিল দারুণ। পোড়ামাটির ফলক, পুরনো দিনের তৈজসপত্র, পোশাক, অলংকার—সবই আমাদের সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি। একটা গ্যালারিতে প্রবেশ করে দেখলাম গ্রামীণ জীবনের নানা চিত্র। কিভাবে হস্তচালিত তাঁতে কাপড় বোনা হতো, কিভাবে কৃষকেরা মাঠে কাজ করতো, কিভাবে নারীরা পাট দিয়ে পাটি বানাতো—এইসব কাজগুলো এত নিখুঁতভাবে উপস্থাপন করা ছিল যে দেখতে দেখতে সময় কখন কেটে গেল বুঝতেই পারিনি। যেন একটা সময়মেশিনে চড়ে আমি সত্যি সত্যি চলে গিয়েছিলাম শত বছর আগের বাংলায়। পুরনো দিনের জীবন যেমন কষ্টের ছিল, তেমনি ছিল সৌন্দর্যে ভরপুর। কৃত্রিমতার ছোঁয়া ছিল না, ছিল মাটির গন্ধ, ছিল পরিশ্রমের মর্যাদা, ছিল প্রকৃতির সাথে সহাবস্থানের শিক্ষা। সোনারগাঁয়ের প্রতিটি প্রদর্শনী এই শিক্ষা নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছে। হয়তো এখন আমাদের জীবন অনেক আধুনিক হয়েছে, প্রযুক্তি এসেছে, গতিশীলতা বেড়েছে, কিন্তু সেই শিকড়ের টান এখনো হৃদয়ে অনুভব করি। এবং সেদিন জাদুঘরে ঘুরে আমার সেই অনুভব নতুনভাবে জেগে উঠলো।
সবচেয়ে ভালো লেগেছে জাদুঘরের পরিবেশ। খুব গোছানো, পরিপাটি, আর শান্ত। ভিড় থাকলেও বিশৃঙ্খলা ছিল না। প্রতিটি অংশে সময় নিয়ে দাঁড়ানো, দেখা, অনুভব করার সুযোগ ছিল। কেউ ছবি তুলছে, কেউ বসে বিশ্রাম নিচ্ছে, কেউ শিশুদের ইতিহাস বোঝাচ্ছে। একটা পরিবার, একটা গল্প, একটা সময় যেন একত্রে মিলেমিশে আছে পুরো পরিবেশে। ফিরে আসার সময় বারবার মনে হচ্ছিল, যেন কিছু একটা ফেলে যাচ্ছি। হয়তো কিছুই ফেলে আসিনি, বরং অনেক কিছু নিয়ে ফিরেছি—সময়ের গল্প, ইতিহাসের টান, শেকড়ের কথা, এবং নিজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অতীতকে ছুঁয়ে দেখার তৃষ্ণা। সোনারগাঁ জাদুঘর শুধু একটা ভ্রমণস্থল নয়, এটা এক ধরনের আত্মঅনুসন্ধান, যেখানে গেলে মানুষ নিজের ভিতরকে একটু বেশি করে চিনে নিতে পারে।
জানিনা আমার আজকের ফটোগ্রাফি গুলো আপনাদের কাছে কেমন লেগেছে। আমার কাছে কিন্তু প্রতিটি ফটোগ্রাফি বেশ ভালো লেগেছে। আপনাদের মতামতের অপেক্ষায় রইলাম।
পোস্ট বিবরণ
| শ্রেণী | ফটোগ্রাফি |
|---|---|
| ক্যামেরা | Vivo y18 |
| পোস্ট তৈরি | @maksudakawsar |
| লোকেশন | ঢাকা , বাংলাদেশ |
আমার পরিচিতি
আমি মাকসুদা আক্তার। স্টিমিট প্লাটফর্মে আমি @maksudakawsar হিসাবে পরিচিত। ঢাকা হতে আমি আমার বাংলা ব্লগের সাথে যুক্ত আছি। আমি একজন গৃহিনী এবং চাকরিজীবী। তারপরও আমি ভালোবাসি আমার মাতৃভাষা বাংলায় নিজের মনের কথা গুলো আমার বাংলা ব্লগের প্লাটফর্মে শেয়ার করতে। আমি ভালোবাসি গান শুনতে এবং গাইতে। আমি অবসর সময়ে ভ্রমন করতে এবং সেই সাথে সুন্দর কিছু ফটোগ্রাফি নিজের ক্যামেরায় বন্দী করতে ও ভালোবাসি। মাঝে মাঝে নিজের মনের আবেগ দিয়ে দু চার লাইন কবিতা লিখতে কিন্তু আমার বেশ ভালোই লাগে। সর্বোপরি আমি ভালোবাসি আমার প্রাণপ্রিয় মাকে।
VOTE @bangla.witness as witness
OR
SET @rme as your proxy
আপনি দেখছি সোনারগায় জাদুঘর থেকে চমৎকার কিছু ফটোগ্রাফি করেছেন। আর ঐতিহ্যবাহী এই ফটোগ্রাফি গুলো দেখলে এমএতে ভালো লাগে। আর আপনার প্রতিটা ফটোগ্রাফি অসাধারণ হয়েছে। এবং সুন্দর বর্ণনা দিয়ে প্রতিটা ফটোগ্রাফি আমাদের মাঝে শেয়ার করেছেন।
সোনারগাঁও জাদুঘরে অনেক সুন্দর সুন্দর কিছু জিনিস রয়েছে। এগুলো তেমন একটা দেখার সুযোগ হয়নি। আজকে আপনার কাছ থেকে চমৎকার কিছু ফটোগ্রাফির মধ্য দিয়ে এই সৌন্দর্য দেখে অনেক বেশি ভালো লাগলো৷ খুব সুন্দর কিছু ফটোগ্রাফি আমাদের মাঝে শেয়ার করেছেন৷ অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে৷