গল্প রাইটিং- অন্ধকারের মেয়ে রুনি -৪র্থ পর্ব
আসসালামু আলাইকুম
কেমন আছেন সবাই? আশা করবো সবাই ভালো আছেন সৃষ্টিকর্তার রহমতে । আমিও আছি আপনাদের দোয়ার বরকতে জীবন নিয়ে ভালোই। তবে কেন জানি আজকাল ব্যস্ততাগুলো আমায় দারুন প্যারা দিচেছ। প্যারা দিচ্ছে জীবন আর সময় দুটোই। কিন্তু আমি তো ব্যস্ততা চাই না। চাই একটু শান্তি আর প্রশান্তি। চাই একটু স্বাধীনতা। যাই হোক এসব কথা বলে শুধু শুধু সময় নষ্ট করে লাভ নেই। তাই চলে যাই আজ আপনাদের জন্য আমার লেখা সুন্দর গল্পে। যা কিনা বাস্তব জীবেন থেকে সংগ্রহ করা।
প্রতিদিনই চেষ্টা করি আমি আপনাদের মাঝে সুন্দর করে কিছু লিখে উপহার দেওয়ার জন্য। চাই চারদিকের বাস্তব কিছু ঘটনাকে গল্পে রূপ দিয়ে আপনাদের মাঝে উপস্থাপন করতে। যাতে করে আমার লেখার যাদুতে আপনারা মুগ্ধ হতে পারেন। যদিও সময় করে উঠতে পারি না। যদিও নিজের ক্রেয়েটিভিটি আপনাদের মাঝে তুলে ধরার সময় হয় না। তবুও চেষ্টা করলাম আপনাদের মাঝে নতুন একটি পোস্ট শেয়ার করার জন্য। আশা করি প্রতিদিনের মত করে আমার আজকের জেনারেল গল্পটিও আপনাদের কাছে বেশ ভালো লাগবে।
রুনি তার জীবনের এমন বোকামির কথা কাউকেই জানতে দেয়নি। নিজের ভেতরে জমিয়ে রেখেছিল সব কষ্ট, সব অনুশোচনা। বাইরে থেকে সবাই ভাবতো রুনি নিশ্চয়ই খুব সাহসী, কিন্তু ভিতরে ভিতরে সে ছিল এক অন্যরকম মানুষ। এমন একজন মেয়ে, যার ভেতর ছিল অসংখ্য অপ্রকাশিত কথা, অপূর্ণ স্বপ্ন আর না বলা ব্যথা। কলেজের ফলাফল যখন হাতে পেল, তখন মনে হলো যেন তার পৃথিবীটা হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। যেভাবে সে পরিশ্রম করেছিল, যত রাত জেগে পড়েছিল, তেমন ফল পাওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু ভাগ্যের লিখন তো কেউ মুছে দিতে পারে না। সেই একটুখানি ভুল, বন্ধুর কথায় ম্যাডামকে বলে বাইরে যাওয়া— সেটাই যেন জীবনের সবচেয়ে বড় মোড় ঘুরিয়ে দিল। রুনি নিজেকে বারবার বোঝাতে চেয়েছিল যে এটা এক মুহূর্তের আবেগ, একটা ছোট ভুল মাত্র। কিন্তু পরীক্ষার মার্কশিট হাতে নিয়ে বুঝতে পারলো, জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্তেরই একটা মূল্য দিতে হয়, আর সে মূল্য অনেক সময় ভয়ানক কঠিন হয়ে আসে।
তবুও রুনি থেমে যায়নি। সে জানতো, কান্না করে কিংবা আফসোস করে কোনো লাভ নেই। তাই নিজেকে শক্ত করল। বাবা-মাকে কিছু জানালো না, কারণ জানলে তারা ভীষণ কষ্ট পেতেন। রুনি ভাবলো, একটা ভুলের জন্য পুরো জীবনকে থামিয়ে রাখা যাবে না। তাই নিজেকে গুছিয়ে নিলো, আবার নতুন করে ভাবতে শুরু করলো কিভাবে সামনে এগোনো যায়। তবুও মনের ভেতর একটা দাগ থেকে গেল। রাতে পড়তে বসলে মাঝে মাঝে চোখ ঝাপসা হয়ে যেত, মনে পড়ত সেই দিনটার কথা। বন্ধুটির মুখ, হাসিটা, কথাগুলো— সব যেন এখনো কানে বাজে। ভাবত, যদি সেদিন না যেত, যদি একটু দৃঢ় হতে পারতো, তাহলে হয়তো আজ জীবনটা অন্যরকম হতো। কিন্তু সেই “যদি”-এর উত্তর আর কোনোদিন পাওয়া যায় না।
দিন কেটে যায়, সময় তার নিজের গতিতে চলে। রুনি আবার আগের মতো নিয়মিত হতে শুরু করল। প্রাইভেট পড়ানো, নিজের পড়াশোনা, বাড়ির কাজ— সব মিলিয়ে এক ধরনের ব্যস্ততায় ডুবে গেল। তবুও ভিতরে একটা একাকিত্ব ছিল। কারণ সে এখন আগের মতো কারও সঙ্গে মন খুলে কথা বলতে পারে না। কলেজের মেয়েরা মাঝে মাঝে কথা বলতো, কিন্তু রুনি হাসতো শুধু শালীনতার খাতিরে। আসলে তার বিশ্বাসটা ভেঙে গিয়েছিল। একবার যাকে বন্ধুর জায়গায় দেখেছিল, সেই বন্ধুই যখন সবচেয়ে বড় আঘাত দিল, তখন আর সহজে কাউকে বিশ্বাস করা যায় না।
তবুও সেই মেয়েটি, যে একসময় তার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু ছিল, আবার একদিন দেখা করতে এল। মুখে হাসি, হাতে কিছু উপহার। রুনি প্রথমে অবাক হলো, তারপর ভেতরে একটা শূন্যতা অনুভব করলো। মেয়েটি বলল, “চলো না আমার গ্রামের বাড়িতে, কয়েকদিন থাকি। কতদিন হয়ে গেল, একটু ঘুরে আসলে তোমার মনও ভালো হয়ে যাবে।” রুনি প্রথমে রাজি হয়নি। বলেছিল, “না, এখন অনেক কাজ, সময় হবে না।” কিন্তু মেয়েটি জোর করতে লাগল। তার মুখের কথায় এমন এক মায়া ছিল, এমন এক টান, যে শেষ পর্যন্ত রুনি না করতে পারলো না।
রুনি ভেবে দেখলো, হয়তো কিছু সময়ের জন্য অন্য পরিবেশে গেলে মনটা একটু ভালো হবে। এতদিন ধরে একঘেয়ে রুটিনে নিজের জীবনকে বন্দি করে রেখেছিল। ভোরে ওঠা, কলেজে যাওয়া, টিউশনে দৌড়ানো, রাতে পড়াশোনা— সব মিলিয়ে যেন নিঃশ্বাস নেওয়ারও সময় ছিল না। তাই ভেতরের একটা অংশ বলল, “চল না, কয়েকদিনের জন্য সব ভুলে যাওয়া যাক।” যদিও সে জানতো, বাবা-মা হয়তো তেমন খুশি হবেন না। তবুও এবার সে নিজের ইচ্ছেটা শুনলো।
বাবা-মাকে বললো, “আমার বান্ধবীর গ্রামের বাড়িতে একটু ঘুরতে যাচ্ছি, তিন-চার দিনের মধ্যেই ফিরে আসবো।” মা একটু চিন্তিত হয়ে বলেছিলেন, “তুমি এখনো ছোট, মেয়েটাকে আমরা চিনিনা।” কিন্তু রুনি তাদের আশ্বস্ত করলো, “না মা, ও খুব ভালো মেয়ে, চিন্তা করো না।” মা আর কিছু বললেন না, শুধু বললেন, “সাবধানে থেকো।”
যেদিন রুনি বের হলো, সকালে আকাশটা ছিল হালকা মেঘলা। ভোরের হাওয়া গায়ে লাগছিল খুব ঠান্ডা ঠান্ডা। ব্যাগ গুছিয়ে, কয়েকটা জামাকাপড় নিয়ে, একটা ছোট ডায়েরি ব্যাগের ভেতর রেখে বের হলো সে। পথে যেতে যেতে মনে হচ্ছিল যেন আবার নতুন কোনো পথে পা বাড়াচ্ছে। মনের ভেতর একটু ভয়, আবার একটু কৌতূহল— দুইয়ের মিশ্র অনুভূতি। তার বান্ধবী হাসতে হাসতে বলছিল, “তুমি না একদম শহরের মেয়ে হয়ে গেছো, গ্রাম দেখতে গিয়ে অবাক হয়ে যেও।” রুনি শুধু হেসে বলেছিল, “দেখা যাক, কেমন লাগে।”
বাসে চড়ার সময় রুনির মনে পড়ছিল কলেজের দিনগুলো। কত কষ্টে সেই মেধাতালিকায় নিজের নাম তুলেছিল, কত পরিশ্রমে একের পর এক ক্লাস টেস্টে ভালো ফল করেছিল। সেই এক মুহূর্তের ভুল যদি না হতো, আজ হয়তো তার জীবনটা অন্য পথে যেত। কিন্তু এখন আর সে অতীত নিয়ে ভাবতে চায় না। সে চায় সামনে তাকাতে, নতুনভাবে শুরু করতে। গ্রামে গিয়ে হয়তো কিছুদিন শান্তিতে থাকতে পারবে, নিজের মনটাকে গুছিয়ে নিতে পারবে— এমনই এক আশায় বুক ভরিয়ে চলছিল সে।
বাস জানালার বাইরে তাকিয়ে রুনি দেখছিল সবুজ মাঠ, ধানগাছের নরম দোল, আকাশে উড়তে থাকা পাখিদের সারি। এই দৃশ্যগুলো যেন তার ভেতরের ক্লান্তি কিছুটা দূর করে দিল। শহরের কোলাহল থেকে অনেক দূরে এই নির্জন পথে হঠাৎ করে একধরনের প্রশান্তি অনুভব করলো রুনি। মনে হলো, হয়তো সত্যিই এই যাত্রাটা দরকার ছিল। জীবনের যতো জটিলতা, যতো কষ্ট— সব যেন ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে।
তবুও মনের এক কোণে একটু সন্দেহ রয়ে গেল। যাকে একসময় সে নিজের জীবনের অংশ মনে করেছিল, সেই বান্ধবী এখন আবার তার জীবনে ফিরে এসেছে— কিন্তু কেন? সত্যিই কি সে বদলে গেছে, নাকি এই যাত্রার পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে? রুনি এসব ভাবতে ভাবতে চুপ করে গেল। মুখে কিছু প্রকাশ করলো না, কারণ সে ক্লান্ত। জীবনের এত লড়াইয়ের পর এখন সে শুধু একটু শান্তি চায়।
বাস এগিয়ে চলছিল গ্রামের দিকে। রোদ এখন নরম হয়ে এসেছে, বাতাসে ধানের গন্ধ। বান্ধবী জানালার পাশে বসে গান গাইছিল নিচু স্বরে। রুনি একসময় চোখ বন্ধ করে ফেললো। তার মনে হচ্ছিল যেন নতুন এক অধ্যায় শুরু হচ্ছে— হয়তো ভালো কিছু অপেক্ষা করছে, হয়তো আরও কিছু পরীক্ষা সামনে আসছে, কে জানে। শহরের ব্যস্ত রাস্তাগুলো, কলেজের বন্ধুরা, প্রাইভেটের ছাত্রছাত্রীরা— সব যেন ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল স্মৃতির অন্ধকারে। রুনি এখন এক নতুন পথে, যেখানে অতীতের বোকামি বা ব্যথা নেই, শুধু এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। তবুও সে এগিয়ে যাচ্ছে, কারণ সে জানে— থেমে থাকলে চলবে না। জীবন যত কঠিনই হোক, চলতে হবে।
বাস যখন গ্রামের সীমানায় ঢুকল, চারপাশে গাছপালা, পাখির ডাক, মাটির গন্ধ— সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত শান্ত পরিবেশ। রুনি জানালার বাইরে তাকিয়ে নিঃশব্দে বললো, “হয়তো এটাই আমার জন্য নতুন শুরু।” এভাবেই রুনি তার সেই বান্ধবীর সাথে গ্রামে চলে গেল, এক অজানা পথে, এক অচেনা ভবিষ্যতের দিকে।
জানিনা আপনাদের কাছে কেমন লাগলো আমার আজকের গল্পটির আজকের পর্ব ? আপনাদের মতামত জানার অপেক্ষায় রইলাম।
আমার পরিচিতি
আমি মাকসুদা আক্তার। স্টিমিট প্লাটফর্মে আমি @maksudakawsar হিসাবে পরিচিত। ঢাকা হতে আমি আমার বাংলা ব্লগের সাথে যুক্ত আছি। আমি একজন গৃহিনী এবং চাকরিজীবী। তারপরও আমি ভালোবাসি আমার মাতৃভাষা বাংলায় নিজের মনের কথা গুলো আমার বাংলা ব্লগের প্লাটফর্মে শেয়ার করতে। আমি ভালোবাসি গান শুনতে এবং গাইতে। আমি অবসর সময়ে ভ্রমন করতে এবং সেই সাথে সুন্দর কিছু ফটোগ্রাফি নিজের ক্যামেরায় বন্দী করতে ও ভালোবাসি। মাঝে মাঝে নিজের মনের আবেগ দিয়ে দু চার লাইন কবিতা লিখতে কিন্তু আমার বেশ ভালোই লাগে। সর্বোপরি আমি ভালোবাসি আমার প্রাণপ্রিয় মাকে।
VOTE @bangla.witness as witness
OR
SET @rme as your proxy