গল্প রাইটিং- অন্ধকারের মেয়ে রুনি -৩য়পর্ব
আসসালামু আলাইকুম
কেমন আছেন সবাই? আশা করবো সবাই ভালো আছেন সৃষ্টিকর্তার রহমতে । আমিও আছি আপনাদের দোয়ার বরকতে জীবন নিয়ে ভালোই। তবে কেন জানি আজকাল ব্যস্ততাগুলো আমায় দারুন প্যারা দিচেছ। প্যারা দিচ্ছে জীবন আর সময় দুটোই। কিন্তু আমি তো ব্যস্ততা চাই না। চাই একটু শান্তি আর প্রশান্তি। চাই একটু স্বাধীনতা। যাই হোক এসব কথা বলে শুধু শুধু সময় নষ্ট করে লাভ নেই। তাই চলে যাই আজ আপনাদের জন্য আমার লেখা সুন্দর গল্পে। যা কিনা বাস্তব জীবেন থেকে সংগ্রহ করা।
প্রতিদিনই চেষ্টা করি আমি আপনাদের মাঝে সুন্দর করে কিছু লিখে উপহার দেওয়ার জন্য। চাই চারদিকের বাস্তব কিছু ঘটনাকে গল্পে রূপ দিয়ে আপনাদের মাঝে উপস্থাপন করতে। যাতে করে আমার লেখার যাদুতে আপনারা মুগ্ধ হতে পারেন। যদিও সময় করে উঠতে পারি না। যদিও নিজের ক্রেয়েটিভিটি আপনাদের মাঝে তুলে ধরার সময় হয় না। তবুও চেষ্টা করলাম আপনাদের মাঝে নতুন একটি পোস্ট শেয়ার করার জন্য। আশা করি প্রতিদিনের মত করে আমার আজকের জেনারেল গল্পটিও আপনাদের কাছে বেশ ভালো লাগবে।
রুনি সব সময়ই ছিল পরিশ্রমী ও দায়িত্বশীল এক মেয়ে। তার জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে ছিল সংগ্রাম, চেষ্টা আর আত্মনিবেদন। কলেজে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই সে বুঝে গিয়েছিল, এখন আর জীবনটা আগের মতো নয়। স্কুলের সীমিত জগৎ থেকে বেরিয়ে এখন তাকে নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। শহরের নামকরা একটি সুনামধন্য কলেজে ভর্তি হয়েছিল রুনি, যেখানে পড়াশোনার পরিবেশ ছিল অত্যন্ত কঠিন। প্রতিটি মাসে ক্লাস পরীক্ষা নেওয়া হতো, আর কোনো বিষয়ে খারাপ করলে অভিভাবকদের ডেকে এনে শিক্ষকরা কঠোরভাবে কথা বলতেন। এমন নিয়মের মাঝে নিজের অবস্থান শক্ত রাখতে হলে মনোযোগী ও পরিশ্রমী হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। তাই রুনি পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়ার পাশাপাশি নিজের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে সুশৃঙ্খলভাবে সাজানোর চেষ্টা করত।
রুনি প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠত, কারণ সকালটা ছিল তার প্রিয় সময়। সকালের হালকা বাতাসে হাঁটতে হাঁটতে সে কলেজে যেত। এই হাঁটার সময়টা ছিল রুনির কাছে যেন একান্ত নিজের সময়, যেখানে সে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবত, নিজের স্বপ্নগুলোকে আঁকড়ে ধরত। ক্লাসে গিয়ে মনোযোগ দিয়ে পড়ত, আর বিরতির সময়গুলোতে বই খুলে নিজেকে আরও প্রস্তুত করত। কলেজ শেষে সে সরাসরি বাড়ি ফিরত না, কারণ বিকেলটা ছিল তার টিউশনের সময়। দু’চারটা প্রাইভেট টিউশন করত সে, যাতে নিজের পড়ার খরচ কিছুটা হলেও নিজে বহন করতে পারে। কখনো কখনো রাত আটটা বা নয়টা পর্যন্ত বাইরে থাকতে হতো, কিন্তু তবুও ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরে খাওয়া দাওয়া সেরে আবার বসত বই নিয়ে।
এই নিয়মিত পরিশ্রমের জীবনই ছিল রুনির বাস্তবতা। বাইরে থেকে কেউ দেখলে হয়তো ভাবত সে এক সাধারণ মেয়ে, কিন্তু তার ভিতরের দৃঢ়তা, অধ্যবসায়, এবং একাগ্রতা ছিল সত্যিই প্রশংসনীয়। কলেজ জীবনে সে নতুন কোনো বন্ধুত্ব গড়েনি। স্কুলজীবনের কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা তাকে ভিতরে ভিতরে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। বাল্য বয়সে বন্ধুদের সঙ্গে কিছু ঘটনার কারণে সে বুঝেছিল, সবাই বিশ্বাসের যোগ্য নয়। তাই কলেজে এসে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিল, নতুন বন্ধুত্ব বা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করেনি। তবে একেবারেই একা ছিল না রুনি। কলেজে আসা-যাওয়ার পথে তার দুইজন মেয়ে বন্ধু তৈরি হয়েছিল, যাদের সঙ্গে সে প্রতিদিন হাঁটত, গল্প করত, আর কিছুটা সময় আনন্দে কাটাত।
সময় ধীরে ধীরে গড়িয়ে গেল। কলেজের পড়াশোনা শেষের পথে, আর সামনে এসে দাঁড়াল জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়—এইচএসসি পরীক্ষা। রুনি এই পরীক্ষাকে খুব গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিল, কারণ সে জানত, এই ফলের ওপর নির্ভর করবে তার ভবিষ্যৎ। কলেজের নিয়ম অনুযায়ী, টেস্ট পরীক্ষায় মেধাতালিকায় প্রথম সাতজন ছাত্রছাত্রী বোর্ড ফরম ফিলাপের জন্য কোনো টাকা দিতে হয় না। সেই তালিকায় নিজের নাম দেখে রুনি আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়। এত বছরের পরিশ্রমের ফল যেন সেদিন হাতের মুঠোয় এসে ধরা দিয়েছিল। পরিবারের সবাই খুশি হয়েছিল, বিশেষ করে মা, যিনি রুনির প্রতিটি সংগ্রামের সাক্ষী ছিলেন।
কিন্তু জীবনে সব কিছু সব সময় নিজের মতো করে চলে না। কখনো কখনো এক মুহূর্তের ভুল পুরো জীবনকে বদলে দিতে পারে। রুনির জীবনেও এমন এক ঘটনা ঘটে যায়, যা আজও তার মনে কাঁটার মতো বিঁধে আছে। স্কুল জীবনের সেই তিক্ত স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত ছিল এক মেয়ের নাম, যার সঙ্গে রুনির একসময় গভীর বন্ধুত্ব ছিল। মেয়েটি একসময় তাকে খুব কাছের মনে করত, কিন্তু পরে সেই বন্ধুত্ব বিশ্বাসঘাতকতায় শেষ হয়। সেই অতীতের ছায়া রুনি মুছে ফেলতে চেয়েছিল, কিন্তু ভাগ্য যেন আবার সেই একই জায়গায় তাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেল।
এইচএসসি পরীক্ষার প্র্যাকটিক্যালের সময় ছিল, সেদিন রুনির সেই পুরোনো বান্ধবী হঠাৎ কলেজে আসে। অনেকদিন পর দেখা, তাই মেয়েটি রুনিকে বলে—“চলো, একটু বাইরে যাই, কিছু কথা বলব।” রুনি প্রথমে রাজি হচ্ছিল না, কিন্তু পুরোনো বন্ধুত্বের টান আর আবেগে পড়ে অবশেষে রাজি হয়ে যায়। সে ম্যাডামকে বলে বাইরে যায়, ভেবেছিল কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে আসবে। কিন্তু সেই কিছুক্ষণই হয়ে গেল তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।
যখন রুনি ফিরে আসে, তখন প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস শেষ হয়ে গেছে। ম্যাডাম তার উপস্থিতি নেননি, এবং নিয়ম অনুযায়ী অনুপস্থিত থাকার জন্য তার নম্বর থেকে ৪০ নম্বর কেটে দেওয়া হয়। এই একটিমাত্র ঘটনার জন্য রুনির সমস্ত পরিশ্রম, ত্যাগ আর সংগ্রামের ফল যেন মুহূর্তেই নষ্ট হয়ে গেল। ফল প্রকাশের দিনটি রুনির জীবনের এক কঠিন দিন। সবার মুখে আনন্দ, কেউ হাসছে, কেউ কেঁদে খুশির অশ্রু ফেলছে। কিন্তু রুনির চোখে ছিল শূন্য দৃষ্টি। তার মার্কশিটে দেখা গেল মোট ৫৮০ নম্বর, আর সে পেয়েছে সেকেন্ড ডিভিশন। মাত্র কিছু নম্বরের জন্য সে হারিয়েছে তার কাঙ্ক্ষিত ফলাফল। তার সেই স্বপ্নভঙ্গের মুহূর্তটা যেন পুরো পৃথিবীকে থামিয়ে দিয়েছিল।
বাড়িতে ফিরে রুনি কিছুই বলতে পারেনি। মা জানতে চাইলেন কী হয়েছে, কিন্তু রুনি শুধু বলল, “ঠিক আছে মা, ফল খারাপ হয়নি।” কিন্তু তার বুকের ভেতরটা তখন ভেঙে চুরমার। এক মুহূর্তের আবেগ আর বন্ধুর প্রতি বিশ্বাসের জন্য সে হারিয়ে ফেলেছে নিজের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা। আজও সে এই কথা কাউকে বলতে পারে না, এমনকি নিজের পরিবারকেও না। সে শুধু জানে, ছোট্ট একটা ভুল কখনও কখনও জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়, আর সেটাই মানুষকে শেখায়—সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করতে হয় নিজের সিদ্ধান্তকে। এরপরও রুনি থেমে যায়নি। সে জানত, জীবন থেমে থাকে না। ভেতরে গভীর কষ্ট থাকলেও বাইরে নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে বুঝেছে, ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়াই জীবনের আসল শক্তি। হয়তো সে তার কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পায়নি, কিন্তু তার চেষ্টা, সততা আর পরিশ্রম এখনো তার জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
রুনির এই গল্পটি শুধু এক মেয়ের ব্যর্থতার গল্প নয়, বরং এটি এক বাস্তব জীবনের শিক্ষা। মানুষ কখনো কখনো আবেগে ভুল করে বসে, কিন্তু সেই ভুলই তাকে পরবর্তীতে আরও দৃঢ় করে তোলে। জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে রুনি তাই শিখেছে—বিশ্বাস, ভালোবাসা, পরিশ্রম, আর সততা—সব কিছুরই একটা সীমা আছে। সেই সীমা রক্ষা করতে না পারলেই জীবন আমাদের কঠিন শিক্ষা দেয়। রুনি আজও সেই দিনগুলোর কথা মনে করলে মনটা ভারী হয়ে আসে, তবুও মনে মনে ভাবে, হয়তো একদিন সব কিছুর মানে সে বুঝতে পারবে। জীবনের প্রতিটি ক্ষতি, প্রতিটি দুঃখ, শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনো শিক্ষা দিয়েই যায়। রুনি এখন জানে, জীবনের পথে কোনো হারানো মানেই শেষ নয়—বরং সেটিই হয়তো নতুন শুরুর দরজা।
জানিনা আপনাদের কাছে কেমন লাগলো আমার আজকের গল্পটির আজকের পর্ব ? আপনাদের মতামত জানার অপেক্ষায় রইলাম।
আমার পরিচিতি
আমি মাকসুদা আক্তার। স্টিমিট প্লাটফর্মে আমি @maksudakawsar হিসাবে পরিচিত। ঢাকা হতে আমি আমার বাংলা ব্লগের সাথে যুক্ত আছি। আমি একজন গৃহিনী এবং চাকরিজীবী। তারপরও আমি ভালোবাসি আমার মাতৃভাষা বাংলায় নিজের মনের কথা গুলো আমার বাংলা ব্লগের প্লাটফর্মে শেয়ার করতে। আমি ভালোবাসি গান শুনতে এবং গাইতে। আমি অবসর সময়ে ভ্রমন করতে এবং সেই সাথে সুন্দর কিছু ফটোগ্রাফি নিজের ক্যামেরায় বন্দী করতে ও ভালোবাসি। মাঝে মাঝে নিজের মনের আবেগ দিয়ে দু চার লাইন কবিতা লিখতে কিন্তু আমার বেশ ভালোই লাগে। সর্বোপরি আমি ভালোবাসি আমার প্রাণপ্রিয় মাকে।
VOTE @bangla.witness as witness
OR
SET @rme as your proxy