প্রশংসা করি মন খুলে
বাঙালি মন খুলে কারও প্রশংসা করতে পারে না। করলে খুব বাড়াবাড়ি করে ফেলে কিংবা অদ্ভুতভাবে সবাইকে অবাক করে দিয়ে একেবারে প্রশংসাই করে না। অনেকের প্রশংসা শুনে অনেক সময় মনে হয়, ‘যাক, বাবা বাঁচা গেল, একটু প্রশংসা তো করেছে।’ পরমুহূর্তেই তার মুখ থেকে বাংলা ভাষার সেই অমোঘ উচ্চারণ ‘কিন্তু’ লাগিয়ে এমন সব কথা বেরিয়ে এল যে শুনে প্রশংসা করে বলে, ‘আমি তবে পালিয়ে বাঁচি।’
বাঙালি জীবনে এই ‘কিন্তু’ শব্দের ক্ষমতা এবং দৌরাত্ম্য, দুই-ই অপরিসীম এবং সুদূরপ্রসারী। চিরকপট বাঙালির সবচেয়ে মোক্ষম অস্ত্রই যেন হচ্ছে ‘কিন্তু’। ঠিক সময়মতো আস্তিনের তলা থেকে বেরিয়ে আসে। যেকোনো বাক্যে কিন্তুর আগের অংশের প্রশংসার সঙ্গে কিন্তুর পরের অংশের নিন্দার কোনো মিলই খুঁজে পাওয়া যাবে না। মনে হবে এ যেন বিপরীত চিন্তাভাবনার দুজন মানুষের আলাদা বক্তব্য। বাক্যের কিন্তুর আগের প্রশংসার অংশটুকু যেন এক বিশাল ফাঁদ, ওই ফাঁদে যেই না পা দিয়েছেন, অমনি কিন্তুর খড়্গ আপনার ওপর পড়ল বলে। বাঙালির এই স্ববিরোধী আচরণের একটা মিষ্টি নাম আছে—‘নিরপেক্ষতা’। কারও প্রশংসা করলে তার সমপরিমাণ নিন্দাও করতে হবে, নইলে নিরপেক্ষতার কী হবে!
কারও পক্ষ নেওয়া যেন ‘পাপ’। আত্মনিষ্ঠতাকে একটু এক পাশে সরিয়ে রেখে বস্তুনিষ্ঠভাবেও যে কারও শুধু প্রশংসা করা যেতে পারে, এটা আমরা মানতেই নারাজ। কারণ, আমাদের কাছে আত্মনিষ্ঠতা বস্তুনিষ্ঠতার চেয়ে অনেক বেশি জরুরি ও মহান। গ্রামের সেই বুড়ির গল্পের মতো। বুড়ি ভীষণ ভালো রান্না করে এবং আর যে যত ভালোই রান্না করুক না কেন, সে তাতে একটা খুঁত বের করবেই। সবাই মিলে পরিকল্পনা করে একদিন এমন ভালো করে তরকারি রান্না করল যেন বুড়ি কোনো খুঁতই ধরতে না পারে। তারপর বুড়ির সামনে আনা হলো সেই তরকারি। বুড়ি খেয়ে, অনেকক্ষণ ধরে ভেবে, শেষ পর্যন্ত বলল, ‘ভালোই হইছে, তবে বেশি ভালো কিন্তু ভালো না।’
অনেক সময় কারও সামনে অনেক প্রশংসা করার পর সে চলে গেলেই শুরু হয় তার নিন্দা। বাঙালি মুসলমানকে গিবতের ব্যাপারে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সতর্ক করা সত্ত্বেও এ ব্যাপারে খুব একটা কিছু করা যায়নি। আমি অনেককেই এই ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে দেখেছি, তারা বলে, গিবত কিংবা অন্যের নিন্দা করার মধ্যে নাকি একটা অদ্ভুত সুখ আছে। সুতরাং গিবত খুব তাড়াতাড়ি বন্ধ হয়ে যাবে, তা মনে হয় না।
তবে আজকাল একদম নতুন প্রজন্মের মধ্যে একধরনের পরিবর্তন লক্ষ করছি। নতুন এই ছোট ছোট মানুষ অনেক বেশি আধুনিক, বিশ্বের সঙ্গে সংযুক্ত ও উদার। তাই বস্তুনিষ্ঠভাবে মানুষের প্রশংসা করা তার জন্য অনেক সহজ। এই মানুষেরা সংখ্যায় যত বাড়তে থাকবে, ততই আমার এই লেখার অসারতা প্রমাণিত হবে।
এখন কথা হচ্ছে, প্রশংসা নিয়ে হঠাৎ এত আলোচনা কেন? এমন একটা ছোট্ট দেশে এত বড় জনগোষ্ঠী এবং এত বড় তরুণ জনগোষ্ঠী যখন গায়ে গা লাগিয়ে আগামীর দিকে এক পা দুই পা করে এগিয়ে যাবে, তখন তাদের সবচেয়ে বড় পাথেয় হবে পরস্পরের সহযোগিতা। আর সেই সহযোগিতা যত না শারীরিক, তার চেয়ে অনেক বেশি মানসিক। একে অপরের ভালো কাজের প্রশংসা করা, একে অপরকে উৎসাহিত করা। এই পিঠ চাপড়ানো, প্রশংসা কিংবা উৎসাহই কিন্তু হাজারো রাত জাগা, হাজার মাইল হাঁটার কষ্টকে ভুলিয়ে দিতে পারে আর তৈরি করতে পারে একটা অগ্রসরমাণ বাংলাদেশ।
Source of shared Content & Image
Sponsored ( Powered by dclick )
What will the next Fear Tactic be?
Its time I wrote something from a stoned open mind, ...
This posting was written via
dclick the Ads platform based on Steem Blockchain.
